নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে অনেকেই আর ঘরে ফেরেন না। কেউ তলিয়ে যান উত্তাল ঢেউয়ে, কেউ নিখোঁজ হন গভীর স্রোতে। কারো লাশ ভেসে ওঠে কয়েকদিন পর, আবার কারো কোনো খোঁজই মেলে না বছরের পর বছর। কিন্তু নদীতে হারিয়ে যাওয়া এসব জেলেকে নিয়ে কিছুদিন কান্না আর আহাজারির পর যেন সব থেমে যায়। খোঁজ নেয় না কেউ-না প্রশাসন, না সমাজ। অনাহার-অর্ধাহারে দিন কাটে তাদের স্ত্রী-সন্তানদের।
ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদী ঘেঁষা জনপদে এমন অসংখ্য পরিবারের বসবাস। বর্ষা মৌসুম এলেই আতঙ্কে থাকেন জেলেরা। তারপরও জীবিকার তাগিদে জীবন হাতে নিয়েই নদীতে নামতে হয় তাদের। কারণ নদীই তাদের একমাত্র ভরসা। কিন্তু সেই নদীই কেড়ে নেয় পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষটিকে। জেলে কার্ড না থাকার অজুহাতে অনেক পরিবার সরকারি সহায়তা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
সম্প্রতি ভোলার চরফ্যাশনে গিয়ে দেখা মেলে এমনই এক হৃদয়বিদারক পরিবারের। প্রায় ছয় মাস আগে নদীতে নিখোঁজ হন জেলে মিজান (৩২)। এখনো তিনি ফেরেননি। স্ত্রী রোজিনা তিন শিশু সন্তানকে নিয়ে অসহায় জীবন কাটাচ্ছেন। একসময় আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশীরা পাশে দাঁড়ালেও এখন আর কেউ খোঁজ নেয় না।
চরফ্যাশন উপজেলার হাজারীগঞ্জ ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা নান্নু মোল্লার ছেলে মিজান ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। প্রতিদিনের মতো মাছ ধরতে গিয়ে ঝড়ের কবলে পড়ে তাদের নৌকা ডুবে যায়। সঙ্গে থাকা অন্য জেলেরা প্রাণে ফিরলেও মিজান আর ফিরে আসেননি। জীবিত কিংবা মৃত-কোনো অবস্থাতেই তার সন্ধান মেলেনি।
দীর্ঘ ছয় মাস পার হলেও এখনো ঘরের দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন তার স্ত্রী ও সন্তানরা। হয়তো একদিন ফিরে আসবেন-এই আশাতেই বেঁচে আছেন তারা।
মিজানের স্ত্রী রোজিনা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘মানুষ প্রথম দিকে অনেক সহানুভূতি দেখাইছে। এখন আর কেউ খবরও নেয় না। তিনটা মাইয়া নিয়ে খুব কষ্টে আছি। মানুষের সাহায্যে কোনোভাবে খেয়ে না খেয়ে দিন যাচ্ছে। সরকারিভাবে কোনো সাহায্য পাইনি।’
স্থানীয়রা জানান, বড় মেয়ে ফাতেমার বয়স এখন ১৩ বছর। মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রাত কাটে রোজিনার। স্বামীর অপেক্ষা আর অভাব-দুটোই এখন তার জীবনের অংশ হয়ে গেছে।
একই উপজেলার আহাম্মদপুর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের জেলে জসিম উদ্দিনের ঘটনাও কম মর্মান্তিক নয়। গত মাসের ১১ তারিখ রাতে ছোট্ট ডিঙি নৌকা নিয়ে তেঁতুলিয়া নদীতে মাছ ধরতে যান তিনি। সকালে আর বাড়ি ফেরেননি। স্বজনরা নদীতে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান পাননি। দুই দিন পর নদীতে ভাসমান অবস্থায় পাওয়া যায় তার মরদেহ।
জসিমও ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার মৃত্যুতে তিন সন্তান নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন স্ত্রী রুমা। কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি বলেন, ‘রাতে মাছ ধরতে গেছে, সকালে ফিরে আসবে-এই আশায় ছিলাম। কে জানত, এটাই তার শেষ যাওয়া হবে!’
শুধু মিজান বা জসিম নন, ভোলার দৌলতখান, মনপুরা, লালমোহন ও তজুমদ্দিন উপজেলার নদীভাঙন ও মাছ ধরার জনপদেও রয়েছে এমন অসংখ্য গল্প। কয়েক বছর আগে মনপুরার হাজিরহাট এলাকার জেলে সেলিম মাঝি মেঘনায় নিখোঁজ হন। আজও তার সন্ধান মেলেনি। স্ত্রী দুই সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। একইভাবে দৌলতখানের চরপাতা এলাকার জেলে কুদ্দুস মাঝি ঝড়ের রাতে নদীতে নিখোঁজ হওয়ার পর আর ফেরেননি। পরিবারটি এখন মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেঁচে আছে।
স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়ী আহসান কবির লিটন বলেন, মিজান-জসিমদের মতো হাজার হাজার প্রকৃত জেলে এখনো জেলে কার্ড পায়নি। অথচ জেলে নয়-এমন অনেকেই কার্ড নিয়ে সরকারি সুবিধা ভোগ করছে। প্রকৃত জেলেদের দ্রুত নিবন্ধনের আওতায় আনতে হবে।
চরফ্যাশন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু বলেন, নিখোঁজ বা নিহত জেলের নামে জেলে কার্ড থাকলে তার পরিবারকে সরকারিভাবে সহায়তা দেওয়া সম্ভব।
তবে নদীপাড়ের মানুষের প্রশ্ন-জেলে কার্ড না থাকলে কি একজন মানুষ জেলে হয়ে ওঠেন না? নদীতে প্রাণ হারানোর পরও কেন তাদের পরিবারের ভাগ্যে জোটে শুধু অনিশ্চয়তা আর দীর্ঘশ্বাস!

