ইরানের সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাবকে ‘সম্পূর্ণভাবে অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার এই মন্তব্যের মাধ্যমে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাত অবসানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
এক মাসেরও বেশি সময় আগে গত ৮ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া সাময়িক যুদ্ধবিরতির পরও দুই দেশের মধ্যে আলোচনায় কোনও অগ্রগতি হয়নি। উভয় পক্ষই একে অপরের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে, বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলে নৌপথ ও জ্বালানি সরবরাহ ঘিরে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে।
কী আছে ইরানের সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাবে?
মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাবে মূলত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হয়েছে।
১. যুদ্ধবিরতি ও আঞ্চলিক সংঘাত বন্ধ
ইরান চায় শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নয়, বরং পুরো অঞ্চলে- বিশেষ করে লেবাননসহ অন্যান্য সংঘাতপূর্ণ এলাকায়- যুদ্ধ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হোক। ইসরায়েল-লেবানন সংঘাতও এর অন্তর্ভুক্ত।
২. হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা
হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে ইরান। এই প্রণালী বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই পথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়।
৩. পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে ধাপে ধাপে আলোচনা
ইরান বলছে, প্রথমে যুদ্ধ বন্ধ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, তারপর পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হবে।
দেশটি কিছু শর্তে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার ইঙ্গিত দিলেও পুরোপুরি বন্ধ করতে রাজি হয়নি। পাশাপাশি তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ প্রায় ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম তৃতীয় কোনও দেশে স্থানান্তরের প্রস্তাবও দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কী?
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছ থেকে তিনটি প্রধান দাবি তুলেছে-
১. ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শূন্যে নামিয়ে আনা
২. পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা
৩. আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি ইরানের সমর্থন বন্ধ করা
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান অন্তত ১২ বছরের জন্য পারমাণবিক কার্যক্রম স্থগিত রাখুক এবং তার ইউরেনিয়াম মজুত হস্তান্তর করুক।
প্রতিদানে ওয়াশিংটন ধীরে ধীরে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং ইরানের আটকে থাকা অর্থ ছাড় করার কথা বলেছে।
কেন বাড়ছে উত্তেজনা?
বর্তমান সংকট আরও তীব্র হয়েছে বেশ কয়েকটি কারণে। এর মধ্যে রয়েছে- যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান, উপসাগরীয় এলাকায় নৌবাহিনীর টানাপোড়েন, জাহাজ আটক ও হামলার ঘটনা, হরমুজ প্রণালীর ওপর কার্যত অবরোধের পরিস্থিতি।
এই পরিস্থিতিতে দুই দেশই একে অপরকে দোষারোপ করছে এবং কোনও পক্ষই মূল অবস্থান থেকে সরে আসছে না।
কূটনৈতিক অচলাবস্থা
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই নিজেদের মূল অবস্থানে অনড়। ফলে আলোচনায় অগ্রগতি হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন শক্ত অবস্থান দেখাতে চাইছে, কিন্তু ইরানও তাদের শর্ত থেকে সরে আসছে না। ফলে এই সংকট থেকে বের হওয়ার ‘স্পষ্ট কোনও পথ’ এখনও দেখা যাচ্ছে না।
সামনে কী হতে পারে?
ইরানের শান্তি প্রস্তাবকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ ঘোষণা করে ট্রাম্প যে অবস্থান নিয়েছেন, তাতে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমার কোনও তাৎক্ষণিক সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। বরং উভয় পক্ষের কঠোর অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে সামনের দিনগুলোতে সম্ভাব্য কয়েকটি পরিস্থিতি আসতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে- অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করা, উপসাগরীয় এলাকায় সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো, সীমিত সামরিক অভিযান বা নৌ-অপারেশন, অথবা দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা অব্যাহত থাকা। আর এটি হলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর এর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে ধারণা করা হচ্ছে, কোনও পক্ষই পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে যেতে চাইছে না। সূত্র: আল-জাজিরা

