হালদাপাড়ে উৎসবের আমেজ

0
হালদাপাড়ে উৎসবের আমেজ

বৈশাখের প্রচণ্ড ঝড় ও বৃষ্টির পর চট্টগ্রামের হালদা নদী থেকে সংগৃহীত কার্প জাতীয় মাছের নিষিক্ত ডিম থেকে পোনা তৈরি করে বিক্রি শুরু করেছেন মৎস্যজীবীরা। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মাছ চাষিরা এসব পোনা সংগ্রহে ভিড় করছেন হালদাপাড়ে। সেই সাথে সামনের পূর্ণিমা তীথিতে পুনরায় ডিম সংগ্রহের প্রস্তুতিও চলছে। ফলে দেশে কার্প জাতীয় মাছের একমাত্র প্রাকৃতিক প্রজননকেন্দ্র হালদা নদীর দুই পাড়ে এখন উৎসবের আমেজ।

হালদা গবেষক ও মৎসজীবীরা জানান, গত সপ্তাহে প্রচণ্ড বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের পর হালদা নদীতে কার্প (রুই, কাতলা, কালিবাউশ) জাতীয় মাছের ডিম ছাড়ার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়। বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত রাউজান ও হাটহাজারী উপজেলায় নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে ছয় হাজার কেজি ডিম সংগ্রহ করেন মৎস্যজীবীরা। এরপর সেসব ডিম প্রাকৃতিকভাবে হ্যাচারিতে প্রক্রিয়াজাত করে পোনায় রূপান্তর করা হয়। গত সোমবার থেকে অনেকেই পোনা বিক্রি শুরু করেন।

জানা গেছে, প্রতিবছর চৈত্র থেকে আষাঢ় মাসের পূর্ণিমা অমাবস্যার তীথিতে বজ্রসহ বৃষ্টিপাতের সাথে পাহাড়ি ঢল নামলে নদীর মা মাছেরা ডিম ছাড়তে শুরু করে। এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে ক্ষেত্রবিশেষে একাধিকবারও ডিম ছাড়ে মা মাছ। বিশেষ ধরনের জাল দিয়ে এসব ডিম সংগ্রহ করা হয়। পরে সেগুলো থেকে প্রাকৃতিক উপায়ে রেণু (পোনা) ফুটিয়ে সারা দেশে সরবরাহ করেন স্থানীয় জেলে ও পোনা ব্যবসায়ীরা।

হালদা গবেষক অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরীয়া জানান, গত ৩০ এপ্রিল প্রথমবার পূর্ণিমার তীথিতে ডিম ছাড়ে মা মাছ। স্থানীয় ডিম সংগ্রহকারী ৬ হাজার কেজি ডিম আহরণ করেছেন। এবার আড়াইশ’ নৌকায় পাঁচ শতাধিক ডিম সংগ্রহকারী নদী থেকে ডিম সংগ্রহ করেছেন। এছাড়া আরও তিনটি জো রয়েছে। আগামী ১৪ মে থেকে ১৯ মে শুরু হওয়া অমাবস্যার তিথীতে অনুকূল পরিবেশ বজায় থাকলে মা মাছ আবারো ডিম ছাড়তে পারে।

হাটহাজারী এলাকার ডিম সংগ্রহকারী মো. আলমগীর জানান, সারা বছর ধরে হালদাপাড়ের ডিম সংগ্রহকারীরা এই সময়ের অপেক্ষায় থাকেন। তবে এবার কিছুটা অগ্রিম ডিম দিয়েছে মা মাছ। সেকারণে পূর্ব প্রস্তুতি কম থাকায় কিছু ডিম সংগ্রহ করা যায়নি। এরপরও যেটুক পাওয়া গেছে কম নয়। আরেকবার ডিম পাওয়া যাবে বলে সবাই প্রত্যাশা করছেন।

এদিকে, গত বৃহস্পতিবার যেসব ডিম সংগ্রহ করা হয়েছে, সেসব ডিম থেকে ইতিমধ্যে পোনা তৈরি করা হয়েছে। প্রতিকেজি পোনা ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকায় পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মৎস্যজীবীরা। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পোনা সংগ্রহকারীরা হালদাপাড়ের হ্যাচারিগুলোতে ভিড় করছেন। তবে প্রথম দফায় সংগৃহীত ডিম থেকে কি পরিমাণ পোনা ফোটানো হয়েছে, সেটার পরিসংখ্যান এখনো চূড়ান্ত করেনি মৎস্য বিভাগ।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম বলেন, আমরা প্রাথমিকভাবে একটা তালিকা তৈরি করে মন্ত্রণালয়কে দিয়েছি। অনুমোদনের পর তালিকা প্রকাশ করা হবে। এখন মৎস্যজীবী ও হ্যাচারির মালিকরাও পোনা প্রক্রিয়াজাত ও বিক্রিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। সেখানে মৎস্য কর্মকর্তারা সবকিছু তদারকি করছেন।

হাটহাজারীর সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. শওকত আলী জানান, বাণিজ্যিক ও ব্যক্তিগত সব হ্যাচারিতে এখন উৎসবের আমেজ। প্রথম দফায় যে ডিম পাওয়া গেছে সেগুলো থেকে সর্বোচ্চ স্বাস্থ্যকর পোনা তৈরি করে বিক্রির চেষ্টা করছেন তারা। তবে চলতি মাসের মাঝামাঝি আবারো ডিম পাওয়া গেলে এই উৎসবের পূর্ণতা পাবে।

মৎস্য কর্মকর্তারা জানান, প্রতি কেজি পোনা মানভেদে ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। সেই হিসেবে অন্তত ২ কোটি টাকার পোনা বিক্রি হতে পারে।

হালদা রিভার রিচার্স ল্যাবরেটরির তথ্য মতে, গত বছর ১৪ হাজার কেজি ডিম সংগ্রহ করেন জেলেরা। তবে এর আগে ২০২৪ সালে মাত্র ১ হাজার ৬৮০ কেজি ডিম পাওয়া যায়। এছাড়া ২০২৩ সালে ১৪ হাজার ৬৬৪ কেজি, ২০২২ সালে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কেজি, ২০২১ সালে সাড়ে ৮ হাজার কেজি ডিম পাওয়া যায়। ২০২০ সালে হালদায় রেকর্ড ২৫ হাজার ৫৩৬ কেজি ডিম পাওয়া যায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here