সেই ‘কাঠবিড়ালি’ বাহিনীতেই তামিলনাড়ুর রাজনীতি ওলটপালট

0
সেই ‘কাঠবিড়ালি’ বাহিনীতেই তামিলনাড়ুর রাজনীতি ওলটপালট

তামিলনাড়ুর দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন এক অভাবনীয় পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে থাকল। পর্দার সুপারস্টার থেকে বাস্তবের জননেতা হয়ে ওঠার লড়াইয়ে থালাপতি বিজয় তার দল তামিলগা ভেরি কাজাগামের (টিভিকে) মাধ্যমে রাজ্যের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে একপ্রকার কোণঠাসা করে দিয়েছেন। যেখানে একসময় ডিএমকে এবং এআইএডিএমকের দ্বিমুখী লড়াইয়ে রাজ্য রাজনীতি সীমাবদ্ধ ছিল, সেখানে বিজয়ের এই নাটকীয় প্রবেশ দক্ষিণ ভারতের ক্ষমতার সমীকরণকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। নির্বাচনী ফলাফলের প্রাথমিক আভাস অনুযায়ী বিজয় এখন জয়ের বন্দরে পৌঁছানোর খুব কাছাকাছি অবস্থান করছেন।

বিজয় এবং তার দলের এই অভাবনীয় সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে দীর্ঘ বছরের সুপরিকল্পিত প্রস্তুতি যা কেবল একটি নির্বাচনী চক্রে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিজয়ের এই রাজনৈতিক অভিযাত্রা শুরু হয়েছিল তার বিশাল ভক্ত সমাজ (রসিগর মন্ডরম)কে একটি সুশৃঙ্খল পরিকাঠামোয় রূপান্তরের মাধ্যমে। রক্তদান শিবির, ত্রাণ কার্যক্রম এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনার মতো সেবামূলক কাজের মাধ্যমে তিনি সাধারণ মানুষের ড্রয়িংরুম পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলেন। এটি কোনো সাময়িক জনহিতকর কাজ ছিল না বরং সাধারণ ভোটারদের সাথে একটি অরাজনৈতিক কিন্তু গভীর আত্মিক সম্পর্ক তৈরির সুদূরপ্রসারী কৌশল ছিল।

২০২১ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিজয়ের কৌশলী পদক্ষপে এই রাজনৈতিক পরিকাঠামোর প্রথম সফল পরীক্ষা সম্পন্ন হয়। সেই নির্বাচনে কোনো আনুষ্ঠানিক দল ছাড়াই তার ফ্যান ক্লাবের সদস্যরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়াই করে অভাবনীয় সাফল্য ছিনিয়ে এনেছিলেন। শতাধিক প্রার্থীর জয় প্রমাণ করেছিল যে বিজয়ের সমর্থকরা কেবল প্রেক্ষাগৃহে শিস বাজাতে দক্ষ নয় বরং বুথ ম্যানেজমেন্ট এবং ভোটারদের সংগঠিত করতেও সমান পারদর্শী। এই প্রাথমিক জয়ই বিজয়কে আত্মবিশ্বাস দিয়েছিল যে তামিলনাড়ুর মানুষ প্রথাগত প্রতীকের বাইরেও নতুন কোনো বিকল্পকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত।

২০২৬ এর নির্বাচনের আগে বিজয়ের দল টিভিকে একটি কর্পোরেট ধাঁচের নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের ক্যাডার বাহিনী গড়ে তোলে। কেবল ভক্ত হলেই যে দলে গুরুত্বপূর্ণ পদ পাওয়া যাবে না, তা তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন কঠোর ইন্টারভিউ এবং ব্যাকগ্রাউন্ড চেকের মাধ্যমে। প্রতিটি ওয়ার্ড এবং বুথ স্তরে এমন সব কর্মীদের দায়িত্ব দেওয়া হয় যারা সাংগঠনিকভাবে দক্ষ এবং জনমানসে স্বচ্ছ ভাবমূর্তি সম্পন্ন। আবেগ এবং পেশাদারিত্বের এই অনন্য মিশেল বিজয়ের দলকে একটি অজেয় রাজনৈতিক মেশিনে পরিণত করে যা প্রতিপক্ষের তুলনায় অনেক বেশি গতিশীল ছিল।

নির্বাচনী প্রচারের ক্ষেত্রেও বিজয়ের কৌশল ছিল অভিনব এবং অত্যন্ত কার্যকর। দলের প্রতীক হিসেবে ‘শিস’ বা হুইসেলকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল যা খুব দ্রুত সাধারণ মানুষের মনে জায়গা করে নেয়। এমনকি রাজ্যের নারীরা তাদের বাড়ির সামনে শিস চিহ্নের আল্পনা বা কোলাম এঁকে এই নতুন শক্তির প্রতি সমর্থন প্রকাশ করতে শুরু করেন। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে পাড়ার মোড় পর্যন্ত এই প্রতীকের প্রচার এমনভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল যা দেখে মনে হয়েছিল এটি একটি স্বতঃস্ফূর্ত গণজাগরণ, যদিও এর নেপথ্যে ছিল দলের সুনিপুণ পরিকল্পনা।

বিজয়ের এই বিশাল কর্মী বাহিনীকে রাজনৈতিক মহলে ‘অনিল’ বা কাঠবিড়ালি বাহিনী হিসেবে অভিহিত করা হয়। এই নামকরণের ইতিহাস বেশ পুরনো এবং এর শেকড় মূলত ২০১১ সালের নির্বাচনে প্রোথিত। পৌরাণিক রামায়ণে লঙ্কায় সেতু তৈরির সময় কাঠবিড়ালি যেভাবে ক্ষুদ্র শক্তিতে সাহায্য করেছিল, বিজয়ের সমর্থকরাও নিজেদের সেই ছোট কিন্তু অপরিহার্য শক্তি হিসেবে মনে করেন। একসময় বিরোধী শিবির এই নামটিকে উপহাস করার জন্য ব্যবহার করলেও সময়ের ব্যবধানে বিজয়ের ভক্তরা এটিকে নিজেদের গর্বের পরিচয় হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছেন।

টিভিকে-র নির্বাচনী মেশিনারি মূলত দীর্ঘদিনের সক্রিয় হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ এবং স্থানীয় নেটওয়ার্কের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়েছে। নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই এই গ্রুপগুলো জনমত গঠন এবং জনসংযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে। বিজয়ের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব প্রতিটি বুথ থেকে আসা তথ্যের ভিত্তিতে তাদের রণকৌশল সাজাতো এবং প্রতিমুহূর্তে তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীদের নির্দেশনা প্রদান করত। এই বিকেন্দ্রীভূত কার্যপদ্ধতি এবং কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের সমন্বয়ই ডিএমকে বা এআইএডিএমকের মতো পুরনো দলগুলোর দুর্গ ধসিয়ে দিতে বড় ভূমিকা রেখেছে।

তামিলনাড়ুর এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কেবল এম কে স্ট্যালিন বা পালানিস্বামীর পরাজয় নয় বরং এটি এক নতুন যুগের সূচনা। বিজয়ের এই উত্থান প্রমাণ করে যে সঠিক জনসেবা, বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা সাংগঠনিক ভিত্তি এবং আধুনিক প্রচার কৌশল থাকলে দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক কাঠামোকেও চ্যালেঞ্জ জানানো সম্ভব।

সূত্র: এনডিটিভি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here