প্রচলিত একটি প্রবাদ আছে, যুদ্ধের ময়দানে প্রথম সত্যটিই সবার আগে মারা যায়। কিন্তু বর্তমান আধুনিক প্রযুক্তির যুগে সত্য সরাসরি মারা যায় না বরং শব্দ আর ফ্রেমের মারপ্যাঁচে সত্যের অবয়ব বদলে দেওয়া হয়। ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সংঘাতের পর পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোর ভূমিকা বিশ্লেষণ করে এমনটাই দাবি করছেন পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, কেবল সংবাদের শব্দচয়ন দিয়েই একটি দেশকে ‘ভিলেন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হচ্ছে।
ফেব্রুয়ারির শেষে ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার পর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর ভাষা লক্ষ্য করলে এক অদ্ভুত পক্ষপাতিত্ব চোখে পড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো ইরানকে একটি ‘মনোলিথিক দুর্গ’ বা কেবল ‘পারমাণবিক উন্মাদনায় মত্ত’ একটি দেশ হিসেবে চিত্রায়িত করেছে। অথচ এই প্রচারণার আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে উত্তর তেহরানের সাধারণ মানুষের জীবন, কফিশপে বসে থাকা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ এবং বছরের পর বছর ধরে নিষেধাজ্ঞার ঘানি টানা সাধারণ ইরানিদের দীর্ঘশ্বাস।
মিডিয়া বিশেষজ্ঞ নোয়াম চমস্কির একটি উক্তি এখানে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছিলেন, মানুষকে অনুগত রাখার চতুর উপায় হলো তাদের চিন্তার পরিসরকে সীমিত করে দেওয়া কিন্তু সেই সীমিত পরিসরের মধ্যেই খুব প্রাণবন্ত তর্কের সুযোগ রাখা। ইরান ইস্যুতেও পশ্চিমা মিডিয়া ঠিক তাই করেছে। তারা যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে বিতর্ক করছে ঠিকই কিন্তু যুদ্ধের মূল কারণ বা পেছনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে তারা অদ্ভুতভাবে নীরব।
আল জাজিরা মিডিয়া ইনস্টিটিউটের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে ‘আত্মরক্ষা’ হিসেবে বর্ণনা করে। অন্যদিকে ইরানের যেকোনো পদক্ষেপকে অভিহিত করা হয় ‘উস্কানি’ হিসেবে। এমনকি গত মার্চে মিনাবে একটি স্কুলে মিসাইল হামলায় ১৭০ জন স্কুলছাত্রী নিহত হওয়ার খবরটিকেও সরাসরি ‘হত্যাকাণ্ড’ না বলে ‘সামরিক ঘাঁটির পাশে অবস্থিত স্কুলে দুর্ঘটনা’ হিসেবে প্রচার করা হয়েছে। এই শব্দচয়নগুলো মূলত বেসামরিক মানুষের মৃত্যুকে স্বাভাবিকীকরণ করে।
নিউ লাইনস ইনস্টিটিউটের সিনিয়র অ্যানালিস্ট ডক্টর দানিয়া আরায়সি মনে করেন, ‘ইরান সংঘাত’ (Iran Conflict) শব্দটির ব্যবহার একটি বড় চালাকি। তার মতে, ‘সংঘাত’ শব্দটি দিয়ে দুই পক্ষকে সমান দায়বদ্ধ করা হয়। এতে করে কারা প্রথম হামলা চালিয়েছে বা কার সামরিক শক্তি অনেক বেশি শক্তিশালী, সেই সত্যটি ধামাচাপা পড়ে যায়। এটি মূলত মিত্র দেশগুলোকে নৈতিক জবাবদিহিতা থেকে বাঁচানোর একটি প্রাতিষ্ঠানিক কৌশল।
সাবেক বিবিসি সাংবাদিক শুমায়লা জাফরি বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, তখন গণবিধ্বংসী অস্ত্রের মিথ্যা বয়ান তৈরি করে সাদ্দাম হোসেনকে দানব বানানো হয়েছিল। তবে বর্তমানে ডিজিটাল মিডিয়ার যুগে মানুষের কাছে বিকল্প তথ্য পৌঁছানোর সুযোগ বেড়েছে। এখন আর আগের মতো একতরফা মিথ্যা প্রচার করে জনমত পুরোপুরি নিজেদের পক্ষে নেওয়া সহজ নয়, যদিও প্রভাবশালী মূলধারার গণমাধ্যমগুলো এখনো তাদের সেই পুরনো কৌশল ধরে রেখেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো প্রায়ই একটি সংঘাতকে তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। ইরানের ওপর দশকের পর দশক ধরে চলা নিষেধাজ্ঞা, ইরানি বিজ্ঞানীদের গুপ্তহত্যা কিংবা স্টাক্সনেটের মতো সাইবার হামলার কথা সংবাদে খুব কমই আসে। ইতিহাসের এই বর্জন বা ‘অ্যাবনরমাল সাইলেন্স’ পাঠকদের যুদ্ধের প্রকৃত কারণ বুঝতে বাধা দেয় এবং একটি নির্দিষ্ট পক্ষের সামরিক আগ্রাসনকে যৌক্তিক হিসেবে উপস্থাপন করে।
সূত্র: জিও নিউজ

