দেশে অস্থিতিশীলতা ও অশান্তি তৈরি করতে বিরোধী দল প্রস্তাবিত বাজেটের বিরোধিতা করছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, তাদের (বিরোধী দল) লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানো নয়; তাদের উদ্দেশ্য একটাই, দেশের মধ্যে একটি অস্থিতিশীতা-অশান্তি তৈরি করা, মানুষকে বিভ্রান্ত করা।
শনিবার কক্সবাজার সদর উপজেলার পিএমখালী পাতলীখাল আনুষ্ঠানিক পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত এক পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘খবরের কাগজগুলোতে দেখলাম, আলহামদুলিল্লাহ, এইবার বাজেটের পরে এখন পর্যন্ত কোন জিনিসের দাম বৃদ্ধি পায়নি। কারণ চাল, ডাল, তেল, নুন সব প্রয়োজনীয় যে জিনিসপত্রগুলো আছে তার ওপর যে সকল ট্যাক্স ছিল, বর্তমান সরকার এই দুইদিন আগের বাজেটে ৬০টি পণ্যের উপর থেকে ট্যাক্স তুলে নিয়েছে, যাতে করে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম না বাড়ে। এর উদ্দেশ্য লক্ষ্য একটাই. দেশের মানুষ যাতে ভালো থাকতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘বিরোধী দল বলছে যে এই বাজেট তারা মানে না, এই গণবিরোধ বাজেট তারা মানে না। আপনাদের কাছে আমি প্রশ্ন রেখে যেতে চাই, যেই বাজেটে ট্যাক্স কমানো হয়, সেই বাজেটও বিরোধী দল মানে না। যেই বাজেটে মদের দাম বাড়ানো হয়, যেই বাজেটে সিগারেটের দাম বাড়ানো হয়, সেই বাজেটও বিরোধী দলের পছন্দ নয়। তাহলে এবার বিরোধী দলের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছেন?’
সরকারপ্রধান বলেন, ‘তাদের (বিরোধী দল) লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানো নয়। তাদের উদ্দেশ্য একটাই, সেটা হচ্ছে দেশের মধ্যে একটি অস্থিতিশীতা-অশান্তি তৈরি করা, মানুষকে বিভ্রান্ত করা।’
গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থ বছরের বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বাজেটে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্বারোপের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। কিন্তু কৃষির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের শিল্প-বাণিজ্য গড়ে তুলতে হবে। শিল্প-বাণিজ্য যদি গড়ে উঠতে পারে, আমাদের সন্তানদের সেখানে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে, তারা চাকরিবাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারবে।
তিনি বলেন, সে কারণেই যেসব দ্রব্য দেশে উৎপাদিত হয়, একই জিনিস যেগুলো বিদেশ থেকে আসে, সেগুলোর ওপর আমরা ট্যাক্স বাড়িয়েছি, যাতে করে দেশে যে দ্রব্যটি উৎপাদিত হচ্ছে, সেই দ্রব্যটি যারা উৎপাদন করে, সেই শিল্প কারখানাটি যাতে সাপোর্ট পেতে পারে, তার ব্যবস্থা আমরা এই বাজেটের মধ্যে রেখেছি। এটিও বিরোধী দলের পছন্দ নয়।
উপস্থিত জনতার উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, এদেশের মালিক আপনারা। দেশের মালিক কোনো রাজনৈতিক দল নয়, কোনো পরিবার নয়; দেশের মালিক হচ্ছে বাংলাদেশের ২০ কোটি জনগণ।
সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী কোদাল দিয়ে মাটি কেটে পাতালী খাল পুনঃখনন কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন এবং খালের পাড়ে একটি চারা রোপণ করেন।
তিনি বলেন, এই দেশই আমাদের প্রথম ঠিকানা, এই দেশই শেষ ঠিকানা। সেজন্যই আমরা বলি, এই দেশকে গড়লে আমরাই ভালো থাকব, আমাদের সন্তানরাই শান্তিতে থাকতে পারবে। দেশকে যদি আমরা গড়তে না পারি তাহলে আমাদের সন্তানরা দুঃখ-কষ্টে থাকবে। কেউ কি চায় নিজের সন্তান কষ্টে থাকুক? কেউ আমরা চাই না। সেজন্যই আমরা একটি কথাই বলি—করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।
সরকারপ্রধান বলেন, বিএনপির রাজনীতি হচ্ছে মানুষের উন্নয়নের জন্য রাজনীতি। এরই ধারাবাহিকতায় সারা দেশে প্রত্যেকটি উপজেলায় ১০ হাজার করে কৃষিকার্ড দেওয়া হবে। কারণ, এই দেশের মানুষ স্বাবলম্বী না হলে দেশ কোনোদিন উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হবে না। ইতিমধ্যে বর্তমান সরকার কৃষিকার্ড, ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া শুরু করেছে।
তিনি বলেন, আমাদের দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী। দেশনেত্রী খালেদা জিয়া মেয়েদের ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত বিনামূল্যে পড়াশোনার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। মেয়েরা শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী না হলে দেশ এগোতে পারবে না। তাই বর্তমান সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, স্নাতক বা ডিগ্রি পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা সম্পূর্ণ ফ্রি করা হবে। শুধু তাই নয়, যারা ভালো ফলাফল করবে তাদের জন্য উপবৃত্তির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে বাজেটে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করে। এসব গ্রামীণ পরিবারকে স্বাবলম্বী করতে মায়েদের হাতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ তুলে দেওয়া হবে।
এ সময় কোনো ষড়যন্ত্রে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য দেশের জনগণের প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন কক্সবাজার সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল মাবুদ। এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানিসহ সরকারের এবং প্রশাসনের নেতৃবৃন্দ ও কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটাই তার প্রথম কক্সবাজার সফর। সফরসূচি অনুযায়ী, পাতলী খালের খনন উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় জনগণের উদ্দেশে এক পথসভায় বক্তব্য দেন। পরে তিনি ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক পরিদর্শন এবং মালুমঘাট সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নেবেন।
এরপর তিনি পেকুয়ায় গিয়ে জুলাই আন্দোলনে চট্টগ্রামের প্রথম শহীদ ওয়াসিম আকরামের কবর জিয়ারত করবেন এবং তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। একই সফরে পেকুয়া পৌরসভা ও মাতামুহুরী উপজেলা প্রতিষ্ঠার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনেরও কথা রয়েছে।
বিকেলে চকরিয়া বাস টার্মিনাল এলাকায় স্থানীয় বিএনপি আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জনসভা শেষে তিনি কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সড়ক ও সমুদ্র সৈকত এলাকা পরিদর্শন করবেন। সফরের শেষ পর্যায়ে হোটেল লং বিচের অডিটোরিয়ামে আয়োজিত সুধী সমাবেশে অংশ নেবেন।
সব কর্মসূচি শেষে রাত প্রায় ১০টার দিকে আকাশপথে ঢাকার উদ্দেশে কক্সবাজার ত্যাগ করার কথা রয়েছে তার।
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে কক্সবাজারজুড়ে জোরদার নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝেও দেখা দিয়েছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। দীর্ঘদিন পর এমন উচ্চপর্যায়ের রাষ্ট্রীয় সফরে নতুন প্রাণচাঞ্চল্যে মুখর হয়ে উঠেছে দেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজার।

