মাঠে গড়াতে বাকি মাত্র তিন সপ্তাহ। উত্তর আমেরিকায় বসতে যাচ্ছে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬। অথচ বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারতে এখনও পর্যন্ত এই টুর্নামেন্টের কোনো সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রি করতে পারেনি ফিফা। কাতার বিশ্বকাপে যে দেশের প্রায় সাড়ে চুয়াত্তর কোটি দর্শক নানা মাধ্যমে খেলা উপভোগ করেছিলেন, সেই ভারতের বাজারে এবার কোনো ক্রেতাই খুঁজে পাচ্ছে না বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ামক সংস্থা।
লিওনেল মেসির সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ ঘিরে যখন বিশ্বজুড়ে উন্মাদনা তুঙ্গে, তখন ভারতের ফুটবলপ্রেমীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। কাতার বিশ্বকাপের সময় রিলায়েন্সের জিও সিনেমা রেকর্ডসংখ্যক দর্শক পেয়েছিল এবং প্রায় ৬০ মিলিয়ন ডলার খরচ করে টুর্নামেন্টের স্বত্ব কিনেছিল। এবার ফিফা শত মিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য নিয়ে বাজার যাচাই করলেও শেষ পর্যন্ত আকাশছোঁয়া দাম অনেক কমিয়ে এনেছে। তবুও দেশটির কোনো বড় সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান বা ওটিটি প্ল্যাটফর্ম এগিয়ে আসছে না।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এবারের বিশ্বকাপ ভারত থেকে সরাসরি সম্প্রচারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে খেলার সময়সূচি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোর সাথে ভারতের সময়ের ব্যবধান ১০ থেকে ১২ ঘণ্টার। ফলে টুর্নামেন্টের ১০৪টি ম্যাচের মধ্যে মাত্র ১৪টি ম্যাচ ভারতের দর্শকরা মাঝরাতের আগে দেখতে পাবেন। এমনকি ফাইনাল ম্যাচটিও অনুষ্ঠিত হবে ভারতীয় সময় অনুযায়ী মাঝরাতের পর, অর্থাৎ ভোর সাড়ে বারোটায়। গত ২০১৮ এবং ২০২২ বিশ্বকাপে যেখানে সিংহভাগ ম্যাচই ভারতীয় দর্শকদের সুবিধাজনক সময়ে হয়েছিল, এবার সেখানে প্রায় সব ম্যাচই দেখতে হবে নিশুতি রাতে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতে খেলাধুলার বিজ্ঞাপনের বাজার মূলত ক্রিকেটনির্ভর। সদ্য সমাপ্ত ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ বা আইপিএলের পেছনেই দেশের বড় বড় বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বার্ষিক বাজেটের সিংহভাগ খরচ করে ফেলেছে। তার ওপর মাঝরাতের ম্যাচের জন্য বিপুল টাকা খরচ করে সম্প্রচার স্বত্ব কেনা ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে চরম ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন টিভি ও ডিজিটাল মাধ্যমের কর্তারা। এমনকি সরকারের কিছু নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে ভারতের ক্রীড়া বিনোদন বাজারে অর্থপ্রবাহ আগের চেয়ে কিছুটা কমেছে। সম্প্রতি ভারতে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ বা লা লিগার মতো জনপ্রিয় টুর্নামেন্টগুলোর সম্প্রচার মূল্য যেভাবে হ্রাস পেয়েছে, তা ফুটবল বাজারের এই মন্দাভাবকেই স্পষ্ট করে।
এদিকে, ভারতের কোটি কোটি ফুটবল ভক্তকে এই হতাশা থেকে মুক্ত করতে আইনি লড়াইও শুরু হয়েছে। দিল্লির হাইকোর্টে এক ফুটবল অনুরাগী আইনজীবী পিটিশন দাখিল করে জানিয়েছেন যে, বিশ্বকাপ দেখার সুযোগ না পাওয়া নাগরিকদের তথ্য পাওয়ার এবং স্বাধীন মতপ্রকাশের সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থী। আদালত এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং দূরদর্শনের কাছে জবাব চেয়েছে।
পার্শ্ববর্তী দেশ চীন শেষ মুহূর্তে ফিফার সাথে সম্প্রচার চুক্তি সই করায় ভারতের দর্শকদের মনে এখনও সামান্য আশা টিকে রয়েছে। যদি শেষ পর্যন্ত কোনো বেসরকারি টিভি চ্যানেল বা অ্যাপ এই স্বত্ব না কেনে, তবে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন দূরদর্শনের দিকেই তাকিয়ে থাকতে হবে সবাইকে। আর তা যদি না হয়, তবে কোটি কোটি ফুটবল ভক্তকে প্রিয় দলের খেলা দেখতে অবৈধ বা পাইরেটেড স্ট্রিমিংয়ের শরণাপন্ন হতে হবে, যা ক্রীড়াবিশ্বে ভারতের ফুটবল আবেগের জন্য এক বড় ধাক্কা।
সূত্র: আল জাজিরা

