ঘনিয়ে আসছে ‘কিউ-ডে’, ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সাইবার বিপর্যয়ের আশঙ্কা!

0
ঘনিয়ে আসছে ‘কিউ-ডে’, ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সাইবার বিপর্যয়ের আশঙ্কা!

বিশ্বব্যাপী সাইবার নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠছে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং প্রযুক্তি। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ‘কিউ-ডে’ নামে পরিচিত একটি সময় খুব দ্রুত সামনে চলে আসছে- যেদিন কোয়ান্টাম কম্পিউটার এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠবে যে, বর্তমানে ব্যবহৃত অধিকাংশ এনক্রিপশন ব্যবস্থা সহজেই ভেঙে ফেলতে পারবে।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, সেই দিনটি এলে ব্যাংকিং লেনদেন, চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি, ব্যক্তিগত ই-মেইল, অবস্থান সংক্রান্ত তথ্য, এমনকি ক্রিপ্টোকারেন্সি ওয়ালেটও নিরাপদ থাকবে না।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক বিশদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯০-এর দশক থেকেই ‘কিউ-ডে’-এর সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা অবগত ছিলেন। তবে সম্প্রতি প্রযুক্তি জায়ান্ট গুগল সতর্ক করে বলেছে যে, ২০২৯ সালের মধ্যেই কোয়ান্টাম কম্পিউটার কিছু এনক্রিপশন ব্যবস্থা ভেঙে ফেলতে সক্ষম হতে পারে। এর ফলে নিরাপত্তা প্রস্তুতির জন্য সময় অনেক কমে এসেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

কানাডাভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান এভোলিউশন কিউ-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মিশেল মস্কা বলেন, “কিউ-ডে হলো সেই সময়, যখন কোনও রাষ্ট্র বা প্রতিপক্ষ এমন কোয়ান্টাম কম্পিউটারের অধিকারী হবে, যা বর্তমানে ব্যবহৃত ক্রিপ্টোগ্রাফি ভেঙে ফেলতে পারবে।”

তিনি আরও বলেন, “এখন সবকিছু নিরাপদ মনে হচ্ছে। কিন্তু একসময় হঠাৎ করেই সব অনিরাপদ হয়ে যেতে পারে। পরিবর্তনটা হবে খুবই নাটকীয়।”

‘হারভেস্ট নাউ, ডিক্রিপ্ট লেটার’ হামলার আশঙ্কা
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, বিভিন্ন রাষ্ট্র বা সাইবার অপরাধীরা ইতোমধ্যে এনক্রিপ্টেড তথ্য চুরি করে সংরক্ষণ করছে। ভবিষ্যতে শক্তিশালী কোয়ান্টাম কম্পিউটার পাওয়া গেলে তারা সেই তথ্য ডিক্রিপ্ট করতে পারবে। এই কৌশলকেই বলা হচ্ছে- ‘হারভেস্ট নাউ, ডিক্রিপ্ট লেটার’

বিশেষ করে স্বাস্থ্য তথ্য, জিনগত তথ্য, আর্থিক রেকর্ড ও রাষ্ট্রীয় গোপন নথি সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কী এই কোয়ান্টাম কম্পিউটিং?
বর্তমান কম্পিউটার তথ্য প্রক্রিয়াজাত করে ‘বিট’ ব্যবহার করে, যেখানে প্রতিটি বিট হয় ০ অথবা ১। কিন্তু কোয়ান্টাম কম্পিউটার ব্যবহার করে ‘কিউবিট’, যা একই সঙ্গে ০ এবং ১-উভয় অবস্থায় থাকতে পারে। এই বৈশিষ্ট্যকে বলা হয় ‘সুপারপজিশন’। এর ফলে কোয়ান্টাম কম্পিউটার একই সময়ে বিপুল পরিমাণ জটিল হিসাব করতে সক্ষম হয়।

বর্তমানে ব্যবহৃত আরএসএ এনক্রিপশন পদ্ধতি নির্ভর করে বড় সংখ্যাকে মৌলিক গুণনীয়কে ভাঙার জটিলতার ওপর। সাধারণ কম্পিউটারের জন্য এটি অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ হলেও কোয়ান্টাম কম্পিউটার অল্প সময়েই তা সমাধান করতে পারে।

ক্রিপ্টোকারেন্সিও ঝুঁকিতে
গুগলের গবেষক ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের যৌথ এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম কম্পিউটার আগের ধারণার তুলনায় অনেক কম সংখ্যক কিউবিট ব্যবহার করেই ক্রিপ্টোকারেন্সির নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে ফেলতে পারবে।

বর্তমানে অধিকাংশ ব্লকচেইন প্রযুক্তি ও ক্রিপ্টোকারেন্সি ‘এলিপটিক কার্ভ ক্রিপ্টোগ্রাফি’ (ইসিসি) ব্যবহার করে। গবেষকরা জানিয়েছেন, কোয়ান্টাম প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে এই নিরাপত্তা ব্যবস্থাও বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

ক্লাউডফ্লেয়ার-ও জানিয়েছে, তারা ২০২৯ সালকে সামনে রেখে ‘পোস্ট-কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি’ বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

বিশ্বজুড়ে সতর্কতা
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেকনোলজি (এনআইএসটি) ইতোমধ্যে কোয়ান্টাম-প্রতিরোধী নতুন এনক্রিপশন অ্যালগরিদম চূড়ান্ত করেছে। হোয়াইট হাউসও ২০৩৫ সালের মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে পোস্ট-কোয়ান্টাম নিরাপত্তা ব্যবস্থায় রূপান্তরের সুপারিশ করেছে। 

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবে এই রূপান্তর সম্পন্ন করতে ১০ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

মার্কিন গণিতবিদ ডাস্টিন মুডি বলেন, “যদি পাঁচ বছরের মধ্যে শক্তিশালী কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি হয়ে যায়, তাহলে তখনও নিরাপত্তা রূপান্তরের কাজ পুরোপুরি শেষ হবে না।”

চিকিৎসা যন্ত্রও হুমকিতে
ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) গবেষক সেওইউন জ্যাং সতর্ক করে বলেছেন, ভবিষ্যতে ইনসুলিন পাম্প, পেসমেকারের মতো বেতার চিকিৎসা যন্ত্রও কোয়ান্টাম হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

তার ভাষায়, “কেউ যদি একটি ইনসুলিন পাম্প হ্যাক করে অতিরিক্ত ডোজ ছাড়ার নির্দেশ পাঠায়, তাহলে তা প্রাণঘাতী হতে পারে।”

তিনি ও তার সহকর্মীরা ইতোমধ্যে অতিক্ষুদ্র একটি মাইক্রোচিপ তৈরি করেছেন, যা পোস্ট-কোয়ান্টাম নিরাপত্তা সুরক্ষা দিতে সক্ষম।

‘ওয়াই-টু-কে’র মতো পরিস্থিতি?
অনেক গবেষক বর্তমান সংকটকে ২০০০ সালের ‘ওয়াই-টু-কে’ কম্পিউটার ত্রুটির সঙ্গে তুলনা করছেন। সে সময় ব্যাপক প্রযুক্তিগত বিপর্যয়ের আশঙ্কা থাকলেও বিশ্বজুড়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার কারণে বড় কোনও বিপদ ঘটেনি।

তবে এবার পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ, ম্যাককিনসির তথ্যানুযায়ী, বিশ্বের ৯০ শতাংশের বেশি প্রতিষ্ঠানের এখনও কোয়ান্টাম নিরাপত্তা মোকাবিলার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেই।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, কোয়ান্টাম যুগের প্রস্তুতি নিতে ব্যর্থ হলে বিশ্ব অর্থনীতি, আর্থিক খাত এবং ব্যক্তিগত তথ্য নিরাপত্তা নজিরবিহীন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। সূত্র: সিএনএন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here