যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার (ইউএসএফ) দুই বাংলাদেশি গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থী জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টি নিখোঁজ হওয়ার কয়েক দিন আগে, ঘাতক হিশাম আবুঘারবিয়াহ ‘চ্যাটজিপিটি’র কাছে হত্যাযজ্ঞ নিয়ে নানা তথ্য জানতে চান। ফ্লোরিডার প্রসিকিউটরদের দাখিল করা এক হলফনামা অনুযায়ী, গত ১৩ এপ্রিল তিনি চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞেস করেন, “মানুষকে কালো আবর্জনার ব্যাগে ভরে ডাস্টবিনে ফেলে দিলে কী ঘটে?
চ্যাটজিপিটির কথোপকথন এখন অপরাধ তদন্তের এক ‘বিস্ফোরক ভাণ্ডার’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএনেড সাম্প্রতিক এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাথে মানুষের গোপনীয় আলাপচারিতা এখন আর ব্যক্তিগত থাকছে না, বরং তা আদালতের গুরুত্বপূর্ণ নথিতে পরিণত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় দুই বাংলাদেশি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে এক রুদ্ধশ্বাস তথ্য। মামলার প্রধান অভিযুক্ত তার অপরাধ সংঘটনের আগে ও পরে চ্যাটজিপিটির কাছে লাশ গুম এবং আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের কৌশল সম্পর্কে একের পর এক প্রশ্ন করেছিলেন।
আদালতের নথি থেকে জানা যায়, হিশাম আবুঘারবিয়াহ নামের ওই অভিযুক্ত তরুণ গত এপ্রিলে চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, কোনো মানুষের দেহ কালো প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে ডাস্টবিনে ফেলে দিলে কী ঘটে। যখন এআই অ্যাপটি তাকে সতর্ক করে দেয়, তখন তিনি পাল্টা জানতে চান যে পুলিশ কীভাবে এই কাজের হদিস পেতে পারে। কেবল এই হত্যাকাণ্ডই নয়, লস অ্যাঞ্জেলেসের দাবানল বা ভার্জিনিয়ার একটি খুনের মামলার ক্ষেত্রেও দেখা গেছে যে, অপরাধীরা তাদের অপরাধের পরিকল্পনা সাজাতে এআই চ্যাটবটের সাহায্য নিয়েছেন। গোয়েন্দাদের মতে, অপরাধীরা মনে করেন এআই-এর সাথে তাদের কথোপকথন হয়তো অত্যন্ত গোপন থাকবে, আর এই আত্মবিশ্বাসই তাদের কাল হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধীদের মানসিক অবস্থা এবং উদ্দেশ্য বোঝার জন্য চ্যাটজিপিটির এই লগগুলো এখন তদন্তকারীদের কাছে সোনার খনির মতো কাজ করছে। মানুষ বর্তমানে আইনি পরামর্শ, চিকিৎসা বা থেরাপির বিকল্প হিসেবেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার শুরু করেছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের অজান্তেই তাদের জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল তথ্যগুলো এই প্রযুক্তির সার্ভারে জমা হয়ে যাচ্ছে। কোনো আইনজীবী, চিকিৎসক বা থেরাপিস্টের সাথে কথা বললে আইনত যে গোপনীয়তার সুরক্ষা পাওয়া যায়, চ্যাটজিপিটির ক্ষেত্রে সেই সুরক্ষা এখন পর্যন্ত কোনো আইনি স্বীকৃতি পায়নি।
ওপেনএআই-এর প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান নিজেই স্বীকার করেছেন যে, চ্যাটজিপিটির সাথে ব্যক্তিগত আলাপচারিতার এই গোপনীয়তাহীনতা একটি বড় সমস্যা। তিনি একটি সাক্ষাৎকারে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন যে, মানুষ তাদের জীবনের সবচেয়ে ব্যক্তিগত বিষয়গুলো চ্যাটবটের কাছে উজার করে দেয়। কিন্তু বর্তমানে এমন কোনো আইন নেই যা এই তথ্যগুলোকে আদালতের সমন বা তদন্ত থেকে রক্ষা করতে পারে। ফলে কোনো আইনি জটিলতা তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো সেই চ্যাট হিস্ট্রি তদন্তকারী সংস্থাকে প্রদান করতে বাধ্য থাকে।
আইনি বিশ্লেষকরা চ্যাটজিপিটির এই ব্যবহারের তুলনা করছেন গুগল সার্চের তথ্যের সাথে। অতীতে অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীদের গুগল সার্চ হিস্ট্রি দেখে তাদের দোষ সাব্যস্ত করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে হত্যার একটি মামলায় অভিযুক্তের গুগলে করা ‘লাশ গুম করার ১০টি উপায়’ সার্চটি অন্যতম প্রধান প্রমাণ হিসেবে কাজ করেছিল। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। প্রসিকিউটরদের মতে, এআই চ্যাটবটের সাথে আলাপচারিতা কেবল একটি তথ্য বিনিময় নয়, বরং এটি অপরাধীর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা অভিসন্ধির ডিজিটাল স্বাক্ষর।
ফ্লোরিডার ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অভিযুক্ত তরুণ শুধু লাশ গুম নিয়েই প্রশ্ন করেননি, বরং তিনি চ্যাটজিপিটির কাছে স্নাইপার বুলেটের আঘাত থেকে বাঁচার উপায় এবং গাড়ির ইঞ্জিন নম্বর পরিবর্তনের কৌশল সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য জানতে চেয়েছিলেন। পুলিশ যখন নিখোঁজ দুই শিক্ষার্থীর দেহ প্লাস্টিকের ব্যাগে উদ্ধার করে, তখন এই চ্যাট হিস্ট্রিগুলো পুরো ঘটনার যোগসূত্র মেলাতে প্রধান ভূমিকা পালন করে। বর্তমানে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রথম গ্রেডের খুনের অভিযোগ আনা হয়েছে এবং আদালত এই ডিজিটাল প্রমাণগুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেছে।
একই সাথে এআই নির্মাতাদের দায়বদ্ধতা নিয়েও নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। ফ্লোরিডার অ্যাটর্নি জেনারেল ইতিমধ্যেই ওপেনএআই-এর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছেন এবং কানাডায় একটি শুটিং ঘটনার ভুক্তভোগী পরিবারগুলো কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিয়েছে। তাদের দাবি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অনেক সময় অপরাধীদের এমন পরামর্শ দেয় যা অপরাধ সংঘটনে সহায়ক হয়। যদিও ওপেনএআই দাবি করেছে তারা নিরাপত্তার স্বার্থে কাজ করছে, তবে গোপনীয়তা ও জননিরাপত্তার এই ভারসাম্য রক্ষা করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা সাধারণ ব্যবহারকারীদের সতর্ক করে বলছেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে বন্ধু, ডাক্তার বা আইনজীবী ভেবে মনের কথা উজার করে বলা বন্ধ করতে হবে। বর্তমান আইনি কাঠামো অনুযায়ী, কম্পিউটার বা ফোনে টাইপ করা প্রতিটি অক্ষর যে কোনো সময় আদালতের সাক্ষ্য হয়ে ফিরে আসতে পারে। প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে আইন হয়তো ভবিষ্যতে কিছুটা বদলাতে পারে, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে চ্যাটজিপিটির ইনপুট বক্সটি কোনোভাবেই ব্যক্তিগত ডায়েরি বা নিরাপদ গোপন কক্ষ নয়। তাই ডিজিটাল নিরাপত্তার স্বার্থে সচেতন থাকার কোনো বিকল্প নেই।
সূত্র: সিএনএন

