বিনিয়োগ সহায়ক বাস্তবায়নই চ্যালেঞ্জ

0
বিনিয়োগ সহায়ক বাস্তবায়নই চ্যালেঞ্জ

জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পেশ করা হয়েছে। সামগ্রিক দিক বিবেচনা করে এই বাজেটকে ব্যবসা ও বিনিয়োগ সহায়ক হিসেবে বিবেচনা করা যায়। তবে সরকারের আকাশচুম্বী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং ঘোষিত নীতিগত সংস্কারগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়নের ওপরই নির্ভর করবে এই বাজেটের প্রকৃত সাফল্য।

বাজেটের কাঠামো ও এডিপি: এই বাজেট বিগত বছরের তুলনায় ১৯.০৪ শতাংশ বেশি। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৩০.৩৪ শতাংশ বাড়ানো অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। এ ছাড়া বাজেটের ঘাটতি পূরণে ব্যাংক খাতের ওপর সরকারের অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা ব্যাংক খাতের পুনরুদ্ধার এবং বেসরকারি বিনিয়োগে ঋণপ্রবাহ সচল রাখার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে না।

তবে সরকারের পরিচালন ব্যয় কমানোর লক্ষ্যমাত্রাটি আপাতদৃষ্টিতে ইতিবাচক। অন্যদিকে তিন লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) গত বছরের চেয়ে ৩০ শতাংশ বেশি হলেও, চলতি বছরের মাত্র ৩৬.১৯ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়ন হার আমাদের দুর্বল সক্ষমতার প্রমাণ দেয়। তাই শুধু বড় বাজেট ও এডিপি ঘোষণা নয়, বরং সফল বাস্তবায়নের ওপর সরকারকে সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে।

কর ব্যবস্থাপনা ও সংস্কার

এবারের বাজেটে কর ব্যবস্থাপনায় বড় কিছু সংস্কার দেখা গেছে। উৎস করকে চূড়ান্ত করের পরিবর্তে অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য করায় ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের একটি বড় দাবি পূরণ হয়েছে। শিল্পের কাঁচামালে উৎস কর ৪ শতাংশে হ্রাস, ৬০টি নিত্যপণ্যে ০.৫ শতাংশ উৎস কর, পাঁচ বছরের কর কাঠামো আগাম ঘোষণা এবং স্বাস্থ্যসেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ইলেকট্রিক যানবাহন খাতে করছাড় অত্যন্ত প্রশংসনীয়।

বিশেষ করে ৪৮ ঘণ্টায় কম্পানি নিবন্ধন, সাত দিনে লাইসেন্স প্রদান, রিস্ক বেসড অডিট, আইবাস প্লাস প্লাস, ই-রিটার্ন, ই-ভ্যাট এবং ইআরপি অনুমোদন কার্যকর হলে ব্যাবসায়িক পরিপালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। ভ্যাটের হার না বাড়িয়ে করের পরিধি সম্প্রসারণ এবং ত্রৈমাসিক অনলাইন ভ্যাট রিটার্নের বিধানকে আমরা স্বাগত জানাই। এ ছাড়া ক্যাশলেস লেনদেন বাড়াতে পিওএস মেশিন আমদানিতে শুল্ক হ্রাস ও আগাম কর শূন্য করা একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

তবে বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি সত্ত্বেও করমুক্ত আয়সীমা অপরিবর্তিত রাখা এবং সর্বোচ্চ আয়কর ৩৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হতাশাজনক। আমরা করমুক্ত সীমা পাঁচ লাখ টাকা করার দাবি জানাচ্ছি। পাশাপাশি টার্নওভার কর ০.৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ করার সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার আহবান জানাই।

সিএমএসএমই খাতের উন্নয়ন

বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার স্টিমুলাস প্যাকেজের আওতায় সিএমএসএমই খাতে ৬ শতাংশ সুদে পাঁচ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া সাধুবাদযোগ্য। এসএমই উদ্যোক্তাদের ৫০ লাখ টাকা এবং নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের জন্য ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভার করমুক্ত রাখা এবং ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ই-লোন (ব-খড়ধহ) চালু করার সিদ্ধান্ত প্রশংসনীয়। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ‘ফ্ল্যাট রেট’ টার্নওভার কর ও আলাদা ভ্যাট রিটার্ন ফরম কর ব্যবস্থাপনাকে অনেক সহজ করবে।

শিল্প, বিনিয়োগ ও ব্যবসা সহজীকরণ

বৈদ্যুতিক গাড়ি, মোবাইল ফোন, ফ্রিজ, এসি ও প্রযুক্তিপণ্যে কর হ্রাস দেশীয় শিল্পে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করবে। ফ্রি ট্রেড জোন স্থাপনের উদ্যোগ বাণিজ্য ও বিনিয়োগের প্রসারে সহায়ক হবে। স্থানীয় ইলেকট্রিক বাস, ট্রাক ও ই-বাইক উৎপাদনে শুল্ক ও ভ্যাট সুবিধা এবং ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানের রেয়াতি সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্তও সময়োপযোগী। তবে প্লাস্টিক পণ্যে ভ্যাট ৭.৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ এবং নির্মাণ খাতে ১০ শতাংশে উন্নীত করা স্থানীয় শিল্পের জন্য নেতিবাচক—আমরা এটি পুনর্বিবেচনার দাবি জানাচ্ছি।

বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়নে সিঙ্গল উইন্ডো বাধ্যতামূলক করা, ওয়ার্ক পারমিট সাত দিনে ও বিনিয়োগকারী ভিসা ১০ দিনে প্রদান, বিদেশি ঋণের সুদে উৎস কর ১০ শতাংশে হ্রাস এবং উৎস কর কর্তনজনিত ব্যয় অগ্রহণযোগ্যতার বিধান বাতিল কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত

বৈদ্যুতিক যানবাহনে ২০৩০ সাল পর্যন্ত ভ্যাট অব্যাহতি, নিবন্ধনে অগ্রিম আয়কর হ্রাস এবং চার্জিং নেটওয়ার্ক আমদানিতে কর শূন্য করা যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। তবে নতুন কূপ খননের যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। আমদানিনির্ভর জ্বালানিতে যদি সুনির্দিষ্ট মূল্য কাঠামো না থাকে, তবে স্বল্পমেয়াদি ভর্তুকি বিনিয়োগের পরিবর্তে শুধু অপচয়ই বাড়াবে। তাই স্টেকহোল্ডারদের মতামতের ভিত্তিতে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই জ্বালানি মূল্য কাঠামো প্রণয়নের জন্য আমি সরকারের কাছে জোর আহবান জানাচ্ছি।

লেখক: সভাপতি, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here