জুলাই অভ্যুত্থান ও অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের টালমাটাল সময় শেষে জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট গতকাল জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিশ্লেষকরা বলছেন, সামগ্রিকভাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট কাঠামোর লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নে অর্থমন্ত্রী চমৎকার রূপরেখা দিলেও আর্থিক খাতের সুশাসন, কর আদায়ে সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ব্যবসাবাণিজ্য চাঙা করতে না পারলে এই বিশাল অঙ্কের হিসাব কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যাওয়ার বড় ঝুঁকি রয়েছে।
প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ কীভাবে বাড়বে : প্রস্তাবিত বাজেটে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির উচ্চাকাক্সক্ষী লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বেসরকারি বিনিয়োগ ব্যাপক হারে বাড়ানোর রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। ঘোষিত বাজেটে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রযুক্তি খাতে প্রতি বছর ২ লাখ নতুন চাকরি এবং ফ্রিল্যান্সিং ও ক্রিয়েটিভ খাত থেকে অতিরিক্ত ৮ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে মোট বিনিয়োগকে জিডিপির ৪০ শতাংশে উন্নীত করবেন। দেশের বর্তমান ভঙ্গুর বিনিয়োগ পরিস্থিতি কাটিয়ে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ বা এফডিআই বর্তমানের চেয়ে ৬ গুণ বাড়িয়ে জিডিপির ২ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিনিয়োগ আকর্ষণে বাজেটের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব ও দিকনির্দেশনা বাজেটকে ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বের করে বিনিয়োগচালিত অর্থনীতিতে রূপান্তরের জন্য অর্থমন্ত্রী ‘থ্রি আর’ কৌশল (রিকাভারি, রেস্টোরেশন এবং রিকনস্ট্রাকশন) ঘোষণা করেছেন।
অর্থমন্ত্রীর থ্রি আর তত্ত্ব কতটা বাস্তবসম্মত : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিনিয়োগচালিত অর্থনীতিতে রূপান্তরের জন্য সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি ইশতেহার ও বাজেটে ঘোষিত থ্রি আর কৌশল একটি সময়োপযোগী ও কাঠামোগত মহাপরিকল্পনা হলেও, বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এর পূর্ণ বাস্তবায়ন বেশ বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলো বিবেচনা করলে এই কৌশলটি আংশিক বাস্তবসম্মত, তবে তা অর্জনের পথ অত্যন্ত কঠিন। দেশের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক খাতকে টেনে তুলতে এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অর্থমন্ত্রীর প্রথম ‘আর’ অর্থাৎ ‘রিকভারি’ ধাপটি অত্যন্ত জরুরি। শুল্ক কমানো এবং তারল্য প্রবাহ বৃদ্ধির মতো নীতিগত উদ্যোগ এই রিকভারি প্রক্রিয়াকে গতিশীল করতে পারে। তবে বর্তমানে ব্যাংকঋণের সুদের হার প্রায় ১৫ শতাংশের কাছাকাছি। এত উচ্চ সুদের হার এবং ডলারসংকটের মধ্যে বেসরকারি খাতের ব্যবসা পুনরুদ্ধার করা এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো অত্যন্ত দুরূহ। অর্থমন্ত্রীর দ্বিতীয় ‘আর’ হচ্ছে ‘রেস্টোরেশন’। বিনিয়োগকারী ও গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য এই প্রক্রিয়াটিও জরুরি। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য বাজেটে বড় ধরনের সংস্কার ও প্রণোদনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি প্রবাসী ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ১ দশমিক ৫ শতাংশ বিশেষ ইনসেনটিভ বা কমিশন দেওয়ার নীতিগত ঘোষণা দিয়েছেন, যা বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে সহায়ক হতে পারে। তবে ব্যাংকিং খাতের ওপর জনগণের ও বিদেশি অংশীদারদের আস্থা তলানিতে চলে গেছে। খেলাপি ঋণের বোঝা কমানো এবং ব্যাংক একীভূতকরণের মতো চলমান বড় সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করতে পারলে বিদেশি বিনিয়োগ আনা সম্ভব হতে পারে। তবে এটিও সময়সাপেক্ষ বিষয়। অর্থমন্ত্রীর তৃতীয় ‘আর’ অর্থাৎ রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাক্সিল্যারেশন (অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও প্রবৃদ্ধি) তত্ত্ব বাস্তবায়নে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্যাকেজ নেওয়া হয়েছে, যা বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানা চালু করতে ব্যবহার হবে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানি আমদানির চড়া ব্যয় কমানোর উদ্যোগ দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতি পুনর্গঠনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। আইসিটি, লেদার, ইলেকট্রনিক্স ও টেক্সটাইল খাতকে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনাও ভালো পদক্ষেপ। কিন্তু বর্তমানের সংকুচিত রাজস্ব আদায় এবং আইএমএফের ঋণের কঠোর শর্তাবলির মধ্যে এই বিশাল পুনর্গঠন তহবিলের জোগান দেওয়া সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থমন্ত্রীর থ্রি আর তত্ত্বটি খাতভিত্তিক সংস্কারের জন্য চমৎকার তাত্ত্বিক ফ্রেমওয়ার্ক। এটি কতটা বাস্তবসম্মত হবে, তা নির্ভর করছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন করে ‘ইজ অব ডুইং বিজনেস’ বা ব্যবসা সহজীকরণের মাধ্যমে বিনিয়োগ কতটা সফলভাবে করা যাচ্ছে এবং আর্থিক খাতের সুশাসন কতটা কঠোরভাবে নিশ্চিত করা যাচ্ছে তার ওপর।
বিনিয়োগ বাড়াতে বাজেটে যেসব রূপরেখা দেওয়া হয়েছে সেগুলো হলো : দীর্ঘমেয়াদি শিল্প বিনিয়োগের সুবিধার্থে একটি শক্তিশালী বন্ড মার্কেট গড়ে তোলার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকারীরা যেন কেবল ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরশীল না থাকেন, সেজন্য দেশের ক্যাপিটাল মার্কেট বা পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। নতুন ও তরুণ উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে আকৃষ্ট করতে বাজেটে ৫০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দেশে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বৈদ্যুতিক বাস ও ট্রাক আমদানিতে করসুবিধা ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। কৃষি খাতে বিনিয়োগ ও উৎপাদন ধরে রাখতে সব ধরনের সার এবং বালাইনাশক আমদানিতে ভ্যাট ও আগাম কর সম্পূর্ণ মওকুফ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগের পথ সুগম করতে সরকার অবকাঠামো ও উন্নয়নমূলক খাতে ৩ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে, যা বিদায়ি অর্থবছরের মূল বরাদ্দের চেয়ে ২৯ শতাংশ বেশি। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজেটের এই বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হলো সরকারের নিজস্ব বিশাল ঘাটতি অর্থায়ন। সরকার নিজেই ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। সরকারের এই বিশাল ব্যাংকঋণনির্ভরতার কারণে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে সংকটে পড়তে পারেন, যা বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
মূল্যস্ফীতি কমানোই যখন চ্যালেঞ্জ : প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আরেকটি ‘উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য’ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। গত মে মাসের হিসাবে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দমমিক ৪ শতাংশ। এটিকে এক বছরের মধ্যে ২ শতাংশীয় পয়েন্ট কমিয়ে আনতে প্রস্তাবিত বাজেটে বাজার স্থিতিশীল রাখার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা ও করের বোঝা কমানোর মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে উৎসে কর হ্রাস : ধান, চাল, গম, আলু, মাছ, পিঁয়াজ ও ভোজ্য তেলসহ প্রায় ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎসে কর সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০ দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে ও পণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে বেশ কিছু নিত্যপণ্যের আমদানিতে শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) যৌক্তিকীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কর ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি মুদ্রানীতির সঙ্গে সমন্বয় করে বাজারে পণ্যের সরবরাহ চেইন ঠিক রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্তদের সুরক্ষা দিতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে সহায়তা এবং ভর্তুকি অব্যাহত রাখার কৌশল নেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য অর্জনে ব্যবসাবাণিজ্য চাঙা করা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো জরুরি।
ব্যবসাবাণিজ্য চাঙা হবে কি : প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যবসাবাণিজ্য চাঙা করতে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণে ব্যবসায়িক পরিবেশ সহজীকরণ ও ট্যাক্স-শুল্ক কাঠামোতে বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সহজ করা হচ্ছে। যেকোনো ত্রুটিহীন সম্পূর্ণ আবেদন জমা দেওয়ার সর্বোচ্চ ৭ দিনের মধ্যে লাইসেন্স, ক্লিয়ারেন্স ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা আনা হচ্ছে। ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার প্রশাসনিক জটিলতা এবং অদৃশ্য খরচ কমাতে একটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল ‘সিঙ্গেল উইন্ডো’ অনুমোদন ব্যবস্থা চালু করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় শিল্পের বিকাশ ও উৎপাদন খরচ কমাতে শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে অগ্রিম আয়কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের নীতিগত অনিশ্চয়তা দূর করতে করপোরেট করের হার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে, যা বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত। প্যাকেজিং শিল্পের প্রবৃদ্ধি বাড়াতে প্যাকেজিং সামগ্রী সরবরাহের ওপর উৎস কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ ক্রয় ও পরিবহন সেবায় উৎস কর কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। দেশে ভোজ্য তেলের উৎপাদন বাড়াতে এবং আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশীয় ভোজ্য তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ১০ বছরের কর অবকাশসুবিধা প্রস্তাব করা হয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহে যুক্ত কোম্পানিগুলোকে ২০৩৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত আয়কর অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে। মোবাইল ফোন, রেফ্রিজারেটর, এসি, ওয়াশিং মেশিন, এটিএম ও সিসিটিভি ক্যামেরা তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের মেয়াদ ২০৩০ সাল এবং সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের জন্য এই মেয়াদ ২০৩১ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য করমুক্ত টার্নওভারের সীমা ৫০ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৭০ লাখ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ফ্রিল্যান্সার ও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের ব্যবসা প্রসারের জন্য বিশেষ ট্যাক্স সুবিধার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কমাতে না পারলে ব্যবসাবাণিজ্য চাঙা করার এসব উদ্যোগ বাজেটের কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
জীবন থেকে নেওয়া বাজেট : ‘এ খাঁচা ভাঙব আমি কেমন করে’ প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ নামে সিনেমার একটি গান। এই গানের মাধ্যমে পরাধীনতার আগল ভেঙে বন্দিদশা থেকে মুক্তির আকুতি উঠে এসেছে। নির্বাচিত বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেটের মূল লক্ষ্যও স্বৈরতন্ত্র ও সংকটের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা। জহির রায়হানের ওই সিনেমায় যেমন স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে মুক্তির সংগ্রাম ছিল ঠিক তেমনই অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী তাঁর বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন, বিগত ফ্যাসিবাদী আমলের বৈষম্য, অনিয়ম ও আর্থিক খাতের দুর্নীতির খাঁচা ভেঙে দেশের অর্থনীতিকে একটি নতুন গণতান্ত্রিক ও বিনিয়োগবান্ধব পথে পরিচালিত করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। গানটিতে খাঁচা ভাঙার মাধ্যমে যে স্বস্তির বাতাসের কথা বলা হয়েছে, বাজেটেও তার প্রতিফলন খোঁজা হয়েছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে স্বস্তি দিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ভারসাম্য আনার প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে কঠোর সংস্কারের উদ্যোগের মাধ্যমে মূলত অর্থনীতির রুদ্ধদ্বার পরিস্থিতিকে মুক্ত করারই ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। বাজেটে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা ও কালোটাকা উদ্ধারের মাধ্যমে অর্থনীতিকে স্বাবলম্বী করার যে পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে, তা দেশের সম্পদ লুণ্ঠনের খাঁচা ভাঙার সঙ্গে তুলনীয়। সিনেমার গল্পের মতো অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে প্রান্তিক ও সাধারণ মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে জোর দেওয়া হয়েছে। নতুন ও টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনৈতিক মুক্তির পথ সুগম করার রূপরেখা দেওয়া হয়েছে, যা কালজয়ী সেই গানের কথা ‘মুক্তির আলো’ খোঁজার চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে অনিয়মে অভ্যস্ত আর ক্ষমতা ও অর্থের বেড়াজালে বন্দি প্রশাসন দিয়ে পরিবর্তিত সময়ের বাজেট বাস্তবায়ন করতে গিয়ে খান আতার মতো অর্থমন্ত্রীর যেন না গেয়ে উঠতে হয়, ‘এ খাঁচা ভাঙব আমি কেমন করে…!’

