বহুমাত্রিক বাধা, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবে কি?

0
বহুমাত্রিক বাধা, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবে কি?

ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতাকারীদের বেঁধে দেওয়া দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির সময়সীমা প্রায় ফুরিয়ে আসছে। গত ৮ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া এই সাময়িক অস্ত্রবিরতি এখন পর্যন্ত বড় কোনো বিচ্যুতি ছাড়াই টিকে থাকলেও একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব কি না তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। 

পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক শান্তি আলোচনা কোনো আনুষ্ঠানিক সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে। তবে যুদ্ধের ভয়াবহতা ও বিশ্ব অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব বিবেচনায় দুই দেশই এখন যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও অন্তত ১৪ দিন বাড়ানোর চিন্তাভাবনা করছে বলে জানা গেছে।

বর্তমান এই যুদ্ধের ফলে ইতিমধ্যে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। চলমান সংঘাতের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে। যুদ্ধের শুরু থেকেই ইরান এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সাধারণ যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। এতে বিশ্ববাজারে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। যদিও ইরান নিজস্ব তেল রপ্তানি সচল রেখেছে কিন্তু অন্য দেশের জাহাজের জন্য তারা আকাশচুম্বী মাশুল দাবি করছে। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রশাসন ইরানের ওপর পাল্টা নৌ-অবরোধ আরোপ করেছে, যাতে করে তেহরানকে হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করতে বাধ্য করা যায়।

হরমুজ প্রণালী নিয়ে সৃষ্ট এই জটিলতা নিরসনই এখন শান্তি আলোচনার প্রধান শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান দীর্ঘকাল ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সহ্য করে আসছে, তাই সহজে তারা এই কৌশলগত সুবিধা হাতছাড়া করতে চাইবে না। অন্যদিকে, মার্কিন অবরোধের পাল্টা জবাব হিসেবে ইরান লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটানোর হুমকি দিয়েছে। ফলে সৌদি আরবের তেল রপ্তানির জন্য নতুন বিপত্তি আসতে পারে। এমনকি যদি দুই পক্ষ সমঝোতায় পৌঁছায়, তবুও হরমুজ প্রণালী দিয়ে পুনরায় স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল শুরু হতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন। কারণ মাইন বা ড্রোন হামলার আতঙ্ক কাটিয়ে বিমা কোম্পানি ও জাহাজ মালিকদের আস্থা অর্জন করা বড় চ্যালেঞ্জ।

পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে মতপার্থক্য ইসলামাবাদ আলোচনার ব্যর্থতার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, ইরানকে অবশ্যই তাদের সব ধরনের পারমাণবিক সক্ষমতা ত্যাগ করতে হবে। ওয়াশিংটনের দাবি হলো, ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সম্পূর্ণ বন্ধ করে তাদের মজুদ থাকা উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বিদেশের হাতে তুলে দিতে হবে। তবে তেহরান বরাবরই এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে আসছে। তারা বেসামরিক প্রয়োজনে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকারের পক্ষে অনড় অবস্থানে রয়েছে। এই মৌলিক বিরোধ মেটানোর কোনো সহজ পথ এখন পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে দৃশ্যমান হয়নি।

লেবানন সীমান্তকে কেন্দ্র করে চলা অস্থিরতা এই শান্তি প্রক্রিয়া আরও জটিল করে তুলেছে। ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চললেও লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ইরান ও পাকিস্তান দাবি করছে যে লেবাননও এই যুদ্ধবিরতির অন্তর্ভুক্ত কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তা মানতে নারাজ। অস্ত্রবিরতি ঘোষণার পরপরই ইসরায়েল লেবাননে তাদের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, লেবাননের মিত্রদের বিপদে ফেলে তেহরান কোনো শান্তি চুক্তি গ্রহণ করবে না। এই ফ্রন্টে উত্তেজনা কমলে তবেই দীর্ঘমেয়াদি কোনো চুক্তির আশা করা যেতে পারে।

ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের মিত্র বাহিনীগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়েও দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের বিরোধ রয়ে গেছে। ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করছে যে ইরানকে অবশ্যই তাদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা সীমিত করতে হবে এবং হিজবুল্লাহ ও হুতির মতো গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়ন বন্ধ করতে হবে। ইরান এই গোষ্ঠীগুলোকে তাদের ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ বলে মনে করে এবং এই প্রভাব বলয় ত্যাগ করতে তারা নারাজ। অন্যদিকে, ইরান শান্তি চুক্তির পূর্বশর্ত হিসেবে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং যুদ্ধকালীন ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে। এমনকি অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের দাবিও তাদের তালিকায় রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মেনে নেওয়া কার্যত অসম্ভব।

এত সব বাধার পাহাড় সত্ত্বেও ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়তো তার চূড়ান্ত অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেন বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এর পেছনে অন্যতম বড় কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও অর্থনীতি। যুদ্ধের প্রভাবে মার্কিন বাজারে পেট্রোলের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করছে। ২০২৬ সালের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই অর্থনৈতিক চাপ ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ। তাই অভ্যন্তরীণ জনমত শান্ত রাখতে এবং বিশ্ববাজারের অস্থিরতা কমাতে একটি আপসকালীন চুক্তির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

শেষ পর্যন্ত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই সংঘাত স্থায়ীভাবে বন্ধ হবে কি না, তা নির্ভর করছে আগামী কয়েক সপ্তাহের কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর। যদি যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো হয় এবং পাকিস্তান বা অন্য কোনো মধ্যস্থতাকারী দেশ দুই পক্ষকে একটি সাধারণ বিন্দুতে আনতে পারে, তবেই হয়তো মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ছায়া থেকে মুক্তি পাবে। অন্যথায়, হরমুজ প্রণালীর অবরুদ্ধ দশা এবং আঞ্চলিক ছায়াযুদ্ধ বিশ্বকে এক গভীরতর সংকটের দিকে ঠেলে দেবে। 

দ্য স্ট্রেইসটাইমসের বিশ্লেষণ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here