চারদিকে শুধুই যুদ্ধের ক্ষতচিহ্ন, মাইলের পর মাইল জুড়ে ধ্বংসস্তূপ আর বোমাবর্ষণে চূর্ণ-বিচূর্ণ হওয়া দালানকোঠা। এর মাঝেই দক্ষিণ গাজার খান ইউনুসের একটি ভাঙাচোরা দোকানের বাইরে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে ধবধবে সাদা একটি বিয়ের পোশাক। আপাতদৃষ্টিতে এটি কেবলই একটি পোশাক মনে হলেও এটি নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়ানো এক টুকরো আনন্দের প্রতিচ্ছবি যেন এটি।
দীর্ঘ দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যেও গাজার মানুষ খুঁজে ফিরছেন বেঁচে থাকার রসদ, আয়োজন করছেন গণবিয়ের। আর এই উৎসবের মূল আকর্ষণ কনেদের বিয়ের পোশাকের জোগান দিতে এখন ভরসা হয়ে উঠেছে পুরোনো ও ব্যবহৃত পোশাক পুনর্ব্যবহারযোগ্য বা রিফারবিশড করার অভিনব উদ্যোগ।
দক্ষিণ গাজার একটি ছোট সেলাই কারখানায় বসে কাপড়ের স্তূপ থেকে পুরোনো গাউন টেনে নিচ্ছিলেন নিসরিন আল-রান্তিসি। যুদ্ধ আর আকাশছোঁয়া খরচের বাজারে বিলুপ্তপ্রায় এক ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে তিনি পুরোনো বিয়ের পোশাকগুলোকে নতুন রূপ দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। নিসরিন জানান, যুদ্ধের আগে যে কাপড় তিনি ১২০ থেকে ১৫০ শেকেলে কিনতে পারতেন, এখন তার দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০০ শেকেলে। এর সাথে যোগ হয়েছে বিদ্যুৎ সংকট। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, প্রথম দিকে সাইকেলের প্যাডেল দিয়ে জেনারেট করা সেলাই মেশিন ব্যবহার করে কাজ করতে হয়েছে তাকে। শুধু নিসরিন নন, গাজার অধিকাংশ মানুষই এখন তাদের সন্তানদের বিয়ের জন্য নতুন পোশাক কিনতে না পেরে ছুটে আসছেন এসব মেরামতের দোকানে। আমদানিকারকদের মতে, সীমান্ত পারাপারে বিলম্ব, উচ্চ শিপিং খরচ এবং পোশাকে ব্যবহৃত ক্রিস্টালের মতো উপাদানের ওপর বিধিনিষেধের কারণে নতুন পোশাকের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। যদিও ইসরায়েলি সামরিক সংস্থা কোগাট দাবি করেছে যে তারা পোশাকের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি, তবে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এই তীব্র সংকটের মুখে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন বিয়ে ঠিক হওয়া তরুণীরা। আগামী চার দিনের মধ্যে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাওয়া ২১ বছর বয়সী শাহেদ ফায়েজ জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে একটি নতুন বিয়ের পোশাক খুঁজছেন কিন্তু পাচ্ছেন না। বাজারে একটি সাধারণ পোশাকের ন্যূনতম ভাড়াও এক হাজার ডলার বা তার বেশি, অথচ তার পুরো পণের বাজেটই মাত্র দুইশো ডলারের নিচে। এমন পরিস্থিতিতে ব্রাইডাল শপের কর্মীরা বলছেন, যুদ্ধের আগের স্বাভাবিক দাম এখন রূপকথার মতো শোনায়। তবে এই চরম হতাশা আর চরম দারিদ্র্যের মাঝেও থেমে নেই জীবন। গাজার বাস্তুচ্যুত ও তাঁবুতে দিন কাটানো তরুণ-তরুণীরা ভাঙা দেয়ালের পাশেই গান গেয়ে, উৎসব করে জুটি বাঁধছেন। আর নিসরিন আল-রান্তিসির মতো কারিগরদের ছেঁড়া কাপড় জোড়া দিয়ে তৈরি করা ওই পুরোনো পোশাকগুলোই এখন গাজার কনেদের মনে এনে দিচ্ছে নতুন জীবনের রঙিন স্বপ্ন।
সূত্র: খালিজ টাইমস

