বয়স ৩৪। ফুটবল ক্যারিয়ারের পড়ন্ত বিকেলে দাঁড়িয়ে নিজের চতুর্থ এবং শেষ বিশ্বকাপ রাঙাতে মরিয়া নেইমার জুনিয়র। কিন্তু যে চোট ক্যারিয়ারজুড়ে তার সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেই চোটই এবারও তার শেষ বিশ্বকাপ রাঙানোর স্বপ্নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজের শেষ বিশ্বকাপকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্য লাস্ট ডান্স হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ব্রাজিলের এই ১০ নম্বর জার্সিধারী। তবে আর মাত্র কয়েকদিন পর মাঠে গড়াতে যাওয়া এই টুর্নামেন্টের আগে নেইমারের চোট এখন পুরো ব্রাজিলকে গভীর উদ্বেগের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
এবারের বিশ্বকাপের আগে ব্রাজিলের প্রস্তুতিটা মোটেও মসৃণ হয়নি। হাঁটুর চোটের কারণে বাছাইপর্বের বড় একটা সময় দলের বাইরে থাকতে হয়েছিল নেইমারকে। তবুও ড্রেসিংরুমে তার প্রভাব এখনো আগের মতোই রয়েছে। কোচ কার্লো আনচেলত্তি এবং সতীর্থরা খুব ভালো করেই জানেন যে, ব্রাজিলের হেক্সা জয়ের অর্থাৎ ষষ্ঠ বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরার স্বপ্ন অনেকাংশেই নির্ভর করছে তাদের এই প্রাণভ্রমরার ওপর। মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি দলের মানসিক শক্তির বড় একটি উৎসও তিনি।
নেইমারের এই মরিয়া লড়াইয়ের শুরুটা হয়েছিল গত ১৭ মে। ব্রাজিলিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের এক ম্যাচে কাফের পেশিতে চোট পান তিনি। শুরুতে তার ক্লাব সান্তোস এটিকে সামান্য ফোলা বা সাধারণ চোট হিসেবে উল্লেখ করায় কোচ আনচেলত্তি তাকে ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত দলে রাখেন। তবে জাতীয় দলে যোগ দেওয়ার পর করা এমআরআই রিপোর্টে গ্রেড-টু পেশির চোট ধরা পড়ে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এই চোট থেকে সেরে উঠতে দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগবে। এই কারণে পানামা ও মিশরের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে মাঠে নামা হয়নি তার। আগামী ১৩ জুন নিউ জার্সিতে মরক্কোর বিপক্ষে ব্রাজিলের প্রথম ম্যাচে তার খেলা নিয়ে এখন বড় রকমের সংশয় তৈরি হয়েছে।
তবে আশার কথা হলো, গ্রুপ পর্বের শেষ দিকে নেইমারকে পাওয়ার ব্যাপারে দারুণ আশাবাদী টিম ম্যানেজমেন্ট। মরক্কো ম্যাচের পর ১৯ জুন ফিলাডেলফিয়ায় হাইতির মুখোমুখি হবে সেলেসাওরা। আর ২৪ জুন মিয়ামিতে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শেষ হবে তাদের প্রথম পর্ব। ধারণা করা হচ্ছে, স্কটল্যান্ডের বিপক্ষেই হয়তো পুরোদমে মাঠে দেখা যাবে নেইমারকে। জাতীয় দলের সর্বশেষ মেডিকেল রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, নেইমারের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া খুব ভালোভাবেই এগোচ্ছে। আজ ৮ জুন থেকেই তার দলের সাথে মূল অনুশীলনে ফেরার কথা রয়েছে।
বিশ্বকাপ শুরুর ২৪ ঘণ্টা আগে পর্যন্ত চোটাক্রান্ত খেলোয়াড় পরিবর্তনের নিয়ম থাকায় ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যমে নেইমারের বিকল্প নিয়ে নানা গুঞ্জন শুরু হয়েছিল। তবে দলের প্রধান কোচ কার্লো আনচেলত্তি সেই গুঞ্জনে পানি ঢেলে দিয়েছেন। ইতালিয়ান এই মাস্টারমাইন্ড অত্যন্ত শান্ত কণ্ঠে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, নেইমার স্কোয়াডেই থাকছেন। যদি মরক্কোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে তাকে নাও পাওয়া যায়, তবে দ্বিতীয় ম্যাচে অবশ্যই তিনি ফিরবেন বলে বিশ্বাস কোচের।
আসলে নেইমারের প্রতি কোচের এই অগাধ বিশ্বাসের পেছনে রয়েছে সান্তোসের হয়ে তার সাম্প্রতিক দুর্দান্ত ফর্ম। গত মার্চ মাসের পর সান্তোসের হয়ে শেষ ১৩ ম্যাচের ১০টিতেই মাঠে নেমেছিলেন তিনি, যার মধ্যে ৭টি ম্যাচেই খেলেছেন পুরো ৯০ মিনিট। সেখানে তার পা থেকে এসেছে ৪টি অ্যাসিস্ট। এই পারফরম্যান্সই প্রমাণ করে যে, নেইমারের ধার এখনো কমেনি। আর তাই দীর্ঘ ২৪ বছর পর বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখা ব্রাজিলের জন্য নেইমার কতটা জরুরি, তা আনচেলত্তি খুব ভালো করেই বোঝেন।
আপাতত দলের অন্য সদস্যরা স্বাভাবিক প্রস্তুতি চালিয়ে গেলেও নেইমার নিউজার্সিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বিশেষ এক পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। কোনো রকম ঝুঁকি না নিয়ে দ্রুত তাকে মাঠে ফেরানোর এই গুরুদায়িত্ব পড়েছে তিনজনের কাঁধে। দলের চিকিৎসক ফেলিপ কালিল, ফিটনেস কোচ ক্রিস্তিয়ানো নুনেস এবং ফিজিওথেরাপিস্ট রাফায়েল মার্তিনি দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন নেইমারকে ফিট করে তুলতে। ঘড়ির কাঁটা যত এগোচ্ছে, বিশ্বকাপের রোমাঞ্চের পাশাপাশি ব্রাজিলের কোটি ভক্তের প্রার্থনাও ততটাই জোরালো হচ্ছে, যেন তাদের প্রিয় তারকা সুস্থ হয়ে জাদুকরী এক শেষ নাচে মেতে উঠতে পারেন।

