ধারণার চেয়েও দ্রুত ছড়াচ্ছে ইবোলা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কতা

0
ধারণার চেয়েও দ্রুত ছড়াচ্ছে ইবোলা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কতা

গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে (ডিআর কঙ্গো) দেখা দেওয়া প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব প্রথমদিকে যতটা অনুমান করা হয়েছিল, তার চেয়েও অনেক দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে বলে সতর্ক করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি প্রদেশকে এই প্রাদুর্ভাবের মূল কেন্দ্রস্থল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে এরই মধ্যে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ১৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা চরম আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

ইতুরি প্রদেশের এক বাসিন্দা বিবিসিকে জানিয়েছেন, আক্রান্ত ব্যক্তিরা অত্যন্ত দ্রুত মারা যাচ্ছেন। ভাইরাসটির ভয়াবহতা তাদের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার পর্যন্ত কঙ্গোতে ৫১৩ জনেরও বেশি মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। শুধু কঙ্গোতেই নয়, প্রতিবেশী দেশ উগান্ডাতেও ইতিমধ্যে একজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি ড. অ্যান অ্যানসিয়া জানিয়েছেন, এই প্রাদুর্ভাব নিয়ে তারা যত বেশি অনুসন্ধান চালাচ্ছেন, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে ভাইরাসটি ইতিমধ্যে অন্যান্য অঞ্চল ও সীমান্ত এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। লন্ডনভিত্তিক ‘এমআরসি সেন্টার ফর গ্লোবাল ইনফেকশিয়াস ডিজিজ অ্যানালাইসিস’-এর একটি গাণিতিক মডেলে দেখা গেছে, মাঠপর্যায়ে অনেক আক্রান্ত রোগী এখনো শনাক্তকরণের বাইরে রয়ে গেছেন। গবেষকদের আশঙ্কা, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা ইতিমধ্যে এক হাজার ছাড়িয়ে গিয়ে থাকতে পারে এবং এর আসল ভয়াবহতা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এদিকে রেড ক্রস সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছে, আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করা না গেলে, সাধারণ মানুষকে সচেতন না করলে এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়লে ইবোলা পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। বর্তমান প্রাদুর্ভাবে এই সবগুলো ঝুঁকিপূর্ণ লক্ষণই দৃশ্যমান। পরিস্থিতি বিবেচনায় ডিআর কঙ্গোর প্রেসিডেন্ট ফেলিক্স শিসেকেডি জরুরি সংকটকালীন বৈঠক শেষে দেশের নাগরিকদের শান্ত থাকার পাশাপাশি সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান টেড্রোস আধানম গেব্রেইয়েসুসও এই মহামারির বিস্তার ও গতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

ধারণা করা হচ্ছে, গত ২৪ এপ্রিল প্রথম রোগী শনাক্ত হওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই এই ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হয়েছিল। চিকিৎসকদের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হলো, এবারের সংক্রমণটি ছড়াচ্ছে ইবোলার বিরল ‘বুন্দিবুুগিও’ স্ট্রেইনের মাধ্যমে, যার প্রতিরোধে কার্যকর কোনো ভ্যাকসিন বা টিকা এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বর্তমানে অন্য কোনো ওষুধ এর বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে পারে কি না, তা খতিয়ে দেখছে।

ইতুরি প্রদেশের তীব্র নিরাপত্তাহীনতা এবং জনগণের ঘন ঘন স্থান পরিবর্তন এই রোগ নিয়ন্ত্রণের কাজকে আরও কঠিন করে তুলেছে। সংক্রমণটি ইতিমধ্যে দক্ষিণ কিভু প্রদেশ এবং কঙ্গোর অন্যতম প্রধান শহর গোমাতেও ছড়িয়ে পড়েছে, যার জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে আট লাখ। এই পরিস্থিতির কারণে প্রতিবেশী দেশ রুয়ান্ডা কঙ্গোর সাথে তাদের সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে এবং উগান্ডা তাদের নাগরিকদের কোলাকুলি ও হ্যান্ডশেক করা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছে। এর মাঝেই ডিআর কঙ্গোতে কর্মরত এক মার্কিন নাগরিক ইবোলার লক্ষণ নিয়ে চিকিৎসার জন্য জার্মানিতে স্থানান্তরিত হয়েছেন এবং তার সংস্পর্শে আসা আরও অন্তত ছয়জন মার্কিন নাগরিককে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে।

সাধারণত ইবোলা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে শুরুতে জ্বর, মাথাব্যথা ও ক্লান্তির মতো ফ্লুর লক্ষণ দেখা দেয়। রোগ বাড়ার সাথে সাথে বমি, ডায়রিয়া এবং পরবর্তীতে অঙ্গ বিকল হওয়ার মতো জটিলতা তৈরি হয়। কোনো কোনো রোগীর ক্ষেত্রে শরীরের ভেতরে ও বাইরে রক্তক্ষরণও হতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত বা বমির মতো শারীরিক তরলের সংস্পর্শে এলে এই ভাইরাস অন্য মানুষের শরীরে ছড়ায়। ডব্লিউএইচও এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় সরকারের সাথে কাজ করছে এবং সাধারণ মানুষকে যেকোনো লক্ষণ দেখামাত্র নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিচ্ছে।

সূত্র: বিবিসি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here