‘তৃণমূল কিছুদিনের মধ্যেই ধ্বংস হয়ে যাবে’, দাবি দলীয় সংসদ সদস্য সুখেন্দুর

0
‘তৃণমূল কিছুদিনের মধ্যেই ধ্বংস হয়ে যাবে’, দাবি দলীয় সংসদ সদস্য সুখেন্দুর

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একসময়ের কট্টর অনুগামীরাই এখন তার সবচেয়ে বড় সমালোচকে পরিণত হয়েছেন। দলের ক্ষমতায় থাকাকালীন দুর্নীতি বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে যারা মুখে কুলুপ এঁটেছিলেন, পরাজয়ের পর তারা এখন একে একে মুখ খুলতে শুরু করেছেন। সব সমালোচনার মধ্যে কলকাতার আর জি কর হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাটি সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে, যা নিয়ে কলকাতার নারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমেছিলেন। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হয়ে দলটির রাজ্যসভার প্রবীণ সংসদ সদস্য সুখেন্দু শেখর রায় এক একান্ত সাক্ষাৎকারে তৃণমূল কংগ্রেসের সম্পূর্ণ বিলুপ্তির ইঙ্গিত দিয়ে এক চরম বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে সুখেন্দু শেখর রায় স্পষ্ট ভাষায় বলেন, আর মাত্র কিছুদিনের মধ্যেই তৃণমূল কংগ্রেস পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে। এমনকি জাতীয় রাজনীতিতেও এই দল এখন তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে এবং বর্তমান পরিস্থিতির পর কোনো রাজনৈতিক দলই আর তৃণমূলের সঙ্গে হাত মেলাবে না। আর জি কর কাণ্ডের সমালোচনা করে তিনি বলেন, আর জি করের পুরো ঘটনাটি যেভাবে সামাল দেওয়া হয়েছিল, তা সম্পূর্ণ ভুল ছিল। অপরাধীদের আড়াল করার একটা স্পষ্ট চেষ্টা সেখানে দেখা গেছে এবং এই কাজে পুলিশ প্রশাসনকে ব্যবহার করা হয়েছে। এই আন্দোলনই তাকে প্রথম ইঙ্গিত দিয়েছিল যে, সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও আবেগ এখন আর দলের পক্ষে নেই, কিন্তু শীর্ষ নেতৃত্ব তা বুঝতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এর পাশাপাশি দলের নেতাদের দুর্নীতির পাহাড় এবং তা নিয়ন্ত্রণে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যর্থতাকে তিনি দায়ী করেন। এমনকি হিন্দু ধর্ম নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কিছু বিতর্কিত মন্তব্যও মানুষের মনে গভীর আঘাত হেনেছে এবং তা দলের রাজনৈতিক আদর্শের পরিপন্থী ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সুখেন্দু শেখর রায়ের মতে, এই সমস্ত ভুলের কারণেই নির্বাচনে তৃণমূলের পরাজয় অনিবার্য ছিল এবং এর জন্য তৃণমূলের তৃণমূল স্তর থেকে শুরু করে শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত প্রত্যেক নেতার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা উচিত। দল ধ্বংসের এই পথটি মূলত তৈরি করেছিল ভোটকুশলী প্রশান্ত কিশোরের সংস্থা ‘আই-প্যাক’ (I-PAC)। দলের দ্বিতীয় প্রধান ও রাজ্যসভার সংসদ সদস্য অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে এই সংস্থাকে আনা হয়েছিল, যা দলের পুরোনো প্রজন্মের নেতারা কখনোই ভালোভাবে নেননি। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে দলের বিপুল বিজয়ের পর সমালোচকরা সাময়িক শান্ত হলেও, এবার তাদের ক্ষোভ চরম আকার ধারণ করেছে। 

সুখেন্দু শেখর সরাসরি অভিযোগ করে বলেন, দলটিকে ধ্বংস করার জন্য আই-প্যাককে লালগালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। নেতাদের অভিযোগ, আই-প্যাকের কারণেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন এবং অর্থের বিনিময়ে দলের পদ বিক্রি করার মতো গুরুতর দুর্নীতিও এই সংস্থার হাত ধরে ঘটেছে।

দলের সমস্ত পদ থেকে ইস্তফা দেওয়া তৃণমূল সংসদ সদস্য কাকলি ঘোষ দস্তিদারও তার পদত্যাগপত্রে আই-প্যাকের এই অনৈতিক ও অগণতান্ত্রিক প্রভাবের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি তার চিঠিতে রেশন দুর্নীতি, শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারি এবং আর জি কর হাসপাতালে চিকিৎসকের মৃত্যু ও তা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টার ফলে জনগণের মধ্যে তৈরি হওয়া তীব্র অসন্তোষের কথা উল্লেখ করে বলেন, একজন বিবেকবান মানুষ হিসেবে তিনি আর চুপ থাকতে পারেননি। 

অন্যদিকে, জেলবন্দি সাবেক মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ও এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সমস্ত দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়ে গেছেন এবং এই ভরাডুবির জন্য মমতা ও অভিষেক দুজনেই সমানভাবে দায়ী। বর্তমানে তৃণমূল কংগ্রেস দলের অভ্যন্তরে জনসমক্ষে সমালোচনা বন্ধ করতে পাঁচ সদস্যের একটি শৃঙ্খলা কমিটি গঠন করেছে এবং দলবিরোধী মন্তব্যের জন্য মুখপাত্র ঋজু দত্তকে ছয় বছরের জন্য বরখাস্ত করেছে, তবে তাতেও দলের ভেতরের এই ঐতিহাসিক বিদ্রোহ দমন করা সম্ভব হচ্ছে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here