চব্বিশের আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সিলেটের কোতোয়ালি থানার একটি ঘটনায় আদালতে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা হয়। মামলায় ১০১ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ২৫০ থেকে ৩০০ জনকে আসামি করা হয়। একই বছরের নভেম্বরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ঢাকার উত্তরা পূর্ব থানার একটি ঘটনায় আদালতে হত্যা মামলা করা হয়। ঢাকার আশুলিয়া থানার একটি ঘটনায় হত্যাচেষ্টা মামলা করা হয়। এই মামলায় বিভিন্ন জেলার ৩৭ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার তদন্তে নেমে এসব মামলার বাদীর খোঁজ পাওয়া যায়নি। এমনকি এজাহারে উল্লেখিত ঠিকানাও সঠিক ছিল না। পরবর্তী সময়ে মামলাগুলো অপ্রমাণিত হয়েছে বলে আদালতকে অবহিত করা হয়। শুধু এই তিনটি ঘটনাই নয়, আদালতে নিষ্পত্তি হওয়া ১৪২টি মামলার মধ্যে ২৪টিই ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়েছে। এ ছাড়া থানায় নিষ্পত্তি হওয়া ৩৭টি মামলার মধ্যে ৯টির তথ্যগত ভুল থাকায় বাতিল করা হয়েছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হত্যা ও হত্যাচেষ্টার ঘটনায় সারা দেশে ১ হাজার ৭৩০টি মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে আদালত ও থানায় দায়ের করা ২৭২টি মামলা তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই। আদালতের ১৯৫টি সিআর (কমপ্লেইন্ট রেজিস্টার) মামলার মধ্যে ১৪২টি মামলা নিষ্পত্তি করেছে সংস্থাটি। এ ছাড়া থানার ৭৭টি জিআর (জেনারেল রেজিস্টার) মামলার মধ্যে ৩৭টি নিষ্পত্তি করা হয়েছে। বাকি ৫৩টি সিআর ও ৪০টি জিআর মামলা তদন্ত করছে সংস্থাটি।
পিবিআইয়ের তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অপ্রমাণিত মামলার বেশির ভাগই বাদী ও সাক্ষীর কোনো অস্তিত্ব নেই। অপ্রমাণিত মামলার তদন্ত করে সংস্থাটি বলছে, মামলার বাদী ও ভুক্তভোগীকে খুঁজে পাওয়া যায়নি, মিথ্যা মামলা, বাদীর অসহযোগিতা ও সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাব, বাদীকে দিয়ে জোর করে মামলা দেওয়া, একই ঘটনায় একাধিক মামলা করা ইত্যাদি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেছেন, তদন্ত প্রক্রিয়ায় সিসিটিভি ফুটেজ, ভিডিও প্রমাণ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা হচ্ছে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মামলাগুলো তদারকি করছেন। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে আমরা তৎপর রয়েছি। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আরও বলছেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বেশির ভাগ মামলায় ইচ্ছামতো আসামি করা হয়েছে। ঘটনা এক থানার মামলা করা হয়েছে আরেক থানায়। ঘটনা ঢাকার, অথচ মামলার আসামি করা হয়েছে বিভিন্ন জেলার লোকজনকে। ঘটনার সঙ্গে কেউ জড়িত থাকলে তাকে অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। আর ঘটনার সঙ্গে কেউ জড়িত না থাকলে তাকে যেন হয়রানির শিকার না হতে হয়, সেটি নিশ্চিত করা হচ্ছে। তদন্ত সম্পন্ন হচ্ছে সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত। তদন্তে যা পাওয়া যাবে সেটাই আমরা রিপোর্টে তুলে আনার চেষ্টা করছি।
পিবিআই সূত্র বলছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হত্যা ও হত্যাচেষ্টার ঘটনায় করা ১৯৫টি সিআর মামলার তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই। এর মধ্যে হত্যা মামলা ২৭টি। হত্যাচেষ্টাসহ অন্যান্য ধারায় রয়েছে ১৬৮টি। আদালতের মাধ্যমে দায়ের করা এসব মামলার দীর্ঘ তদন্ত শেষে ১৪২টি নিষ্পত্তি করেছে সংস্থাটি। নিষ্পত্তিকৃত এসব মামলার মধ্যে ১৮টি হত্যা এবং ১২৪টি অন্যান্য ধারার মামলা। এর মধ্যে প্রমাণিত ৯০টি ও অপ্রমাণিত ২৪টি মামলা রয়েছে। অন্যান্য ২৮টি মামলা বাতিল, রিকলমূলে নিষ্পত্তি, বাদী কর্তৃক ২৪৮ ধারায় প্রত্যাহার। ১৪২টি নিষ্পত্তি মামলার আসামি ছিলেন ৮ হাজার ৭২৮ জন; এর মধ্যে ৩ হাজার ১৩৪ জনের বিরুদ্ধে প্রমাণ মিলেছে এবং ৫ হাজার ৫৫৪ জনের বিরুদ্ধে প্রমাণ না মেলায় অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সিআর নিষ্পত্তিকৃত মামলার প্রমাণের হার ৩৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ এবং অপ্রমাণিতের হার ৬৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
এদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হত্যা ও হত্যাচেষ্টার ঘটনায় করা ৭৭টি জিআর মামলার তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই। এর মধ্যে হত্যা মামলা ৫৭টি। হত্যাচেষ্টাসহ অন্যান্য ধারায় রয়েছে ২০টি। থানায় দায়ের করা এসব মামলার দীর্ঘ তদন্ত শেষে ৩৭টি নিষ্পত্তি করেছে সংস্থাটি। নিষ্পত্তিকৃত এসব মামলার মধ্যে ২৩টি হত্যা এবং ১৪টি অন্যান্য ধারার মামলা। এর মধ্যে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে ২০টির, ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে ৯টির এবং অন্যান্যভাবে নিষ্পত্তি মামলা ৮টি রয়েছে। চার্জশিট দেওয়া ২০টি মামলার আসামি ছিলেন ৯০৪ জন; এর মধ্যে ৫৬৭ জনের বিরুদ্ধে প্রমাণ মিলেছে এবং ৩৩৭ জনের বিরুদ্ধে প্রমাণ না মেলায় অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জিআর নিষ্পত্তিকৃত মামলার অভিযুক্তের হার ৬২ দশমিক ৭২ শতাংশ এবং অব্যাহতিপ্রাপ্তের হার ৩৭ দশমিক ২৮ শতাংশ। ৯টি ফাইনাল রিপোর্টের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ঘটাস্থল ভিন্ন ছিল, ভুক্তভোগীর অবস্থান ঘটনাস্থলে না থাকা, বাদী ভুক্তভোগীকে উপস্থাপন করতে না পারা ইত্যাদি। এ বিষয়ে পিবিআইপ্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. মোস্তফা কামাল জানান, পারিবারিক ঘটনাকে জুলাইয়ের ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়া, ২০২৩ সালে আহত হয়েছে অথচ মামলা দেওয়া হয়েছে জুলাইয়ে আহত হওয়ার, এভাবে যতগুলো মিথ্যা মামলা পাওয়া গেছে সেগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে। অনেক মামলার ক্ষেত্রে প্রকৃত অপরাধীদের পরিবর্তে অনেকের নাম যুক্ত করা হয়েছে। আমরা সেসব নাম বাদ দিয়ে নিরপেক্ষতা বজায় রেখে প্রকৃত আসামিদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করছি।

