কিউবা ঘিরে বাড়ছে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা

0
কিউবা ঘিরে বাড়ছে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা

ক্যারিবীয় অঞ্চলে ড্রোন যুদ্ধের বিস্তার এবং পরাশক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা গভীর হওয়ার সাথে সাথে কিউবা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কেবল প্রথাগত সামরিক হুমকি হিসেবে নয় বরং অসম চাপ, গোয়েন্দা প্রতিযোগিতা এবং ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের এক নতুন ক্ষেত্র হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। 

সম্প্রতি মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়ার জোন’ এক প্রতিবেদনে সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়েছে, ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযান ‘অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলভ’-এর প্রস্তুতি পর্বে ক্যারিবীয় অঞ্চলে বহু মার্কিন যুদ্ধবিমান উন্মুক্তভাবে পার্ক করে রাখা হয়েছিল। এর ফলে কিউবা থেকে সম্ভাব্য ড্রোন হামলার মুখে মার্কিন সামরিক সক্ষমতা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন সামরিক বিশেষজ্ঞরা।

এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান যুদ্ধ এই ধরনের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ধ্বংসাত্মক ক্ষমতাকে বিশ্বমঞ্চে নতুন করে প্রমাণ করেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’-এর চলতি মাসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের এপ্রিলে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু হওয়ার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ইরানি হামলায় অন্তত ২২৮টি স্থাপনা ও সামরিক সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান এয়ার বেসে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং উচ্চ-প্রযুক্তিসম্পন্ন ‘ই-৩ সেন্ট্রি’ কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল বিমানটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গেছে।

ক্যারিবীয় অঞ্চলে মার্কিন নিরাপত্তার জন্য আরেকটি বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে কিউবায় অবস্থিত চীন ও রাশিয়ার গোয়েন্দা বা নজরদারি ঘাঁটিগুলো। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের একটি যৌথ প্রতিবেদনে গবেষক ম্যাথিউ ফুনাইওল উল্লেখ করেন, কিউবার বেজুকার, ওয়াজায়, কালাবাজার এবং এল সালাও—এই চারটি সাইটে এমন অত্যাধুনিক সরঞ্জাম রয়েছে যা মার্কিন যোগাযোগ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত করতে, স্যাটেলাইটের ওপর নজরদারি চালাতে এবং সামরিক কার্যক্রম ট্র্যাক করতে সক্ষম। 

কিউবা যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার খুব কাছাকাছি হওয়ায় সেখান থেকে মার্কিন সামরিক যোগাযোগ, রকেট উৎক্ষেপণ এবং নৌবাহিনীর কার্যক্রম সহজেই পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে। এছাড়া, রাশিয়ার বৃহত্তম বিদেশি সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স সাইট ‘লুর্দেস’-এ রুশ কর্মীদের পুনরায় প্রত্যাবর্তন ওয়াশিংটনের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

তবে এই ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের মধ্যেও ভিন্নমত পোষণ করেছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। ‘ডিফেন্স প্রায়োরিটিজ’-এর ২০২৬ সালের জানুয়ারির একটি প্রতিবেদনে গবেষক ড্যানিয়েল ডেপেট্রিস যুক্তি দেখিয়েছেন যে, কিউবাকে নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হলেও ১৯৬২ সালের ঐতিহাসিক ‘কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস’ বা কিউবা ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের সময় যে ‘মিউচুয়ালি অ্যাসিউর্ড ডেস্ট্রাকশন’  যুক্তি কাজ করেছিল, তা আজও যেকোনো বড় ধরনের উত্তেজনা বৃদ্ধিকে স্তিমিত করে রাখছে। তিনি আরও যোগ করেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সংঘাতের মূল কেন্দ্রস্থল যেহেতু প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল, তাই কিউবায় থাকা চীনা গোয়েন্দা ঘাঁটিগুলো বেইজিংয়ের জন্য খুব বেশি কৌশলগত সুবিধা দেবে না।

তা সত্ত্বেও, কিউবার মতো তুলনামূলক ছোট একটি দেশের হুমকি মোকাবিলা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে বড় ধরনের কৌশলগত মূল্য দিতে হচ্ছে, যা মার্কিন সামরিক শক্তিকে অন্য ফ্রন্টে দুর্বল করে ফেলছে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, কিউবাকে ভয় দেখানোর জন্য বা সেখানে হামলার প্রস্তুতি হিসেবে ক্যারিবীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে গিয়ে ওয়াশিংটন তার বৈশ্বিক সম্পদ ও মনোযোগের ভারসাম্য হারাচ্ছে। মার্কিন সামরিক পত্রিকা ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’ জানিয়েছে, ২০২৫ সালের নভেম্বরে ‘অপারেশন সাউদার্ন স্পিয়ার’-এর সময় যুক্তরাষ্ট্র তার মোট সচল যুদ্ধজাহাজের ২০ শতাংশই ক্যারিবীয় অঞ্চলে মোতায়েন করতে বাধ্য হয়েছিল। যার ফলে ভূমধ্যসাগর এবং মধ্যপ্রাচ্যের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলো মার্কিন বিমানবাহী রণতরী (এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার) শূন্য হয়ে পড়েছিল।

কিউবায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসনের গুঞ্জন তৈরি হলেও, স্প্যানিশ ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষক রোসিও দে লোস রেয়েস রামিরেজ ২০২৬ সালের এপ্রিলের এক নিবন্ধে লিখেছেন, নিকট ভবিষ্যতে কিউবায় সরাসরি মার্কিন হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা কম। তবে রাজনৈতিক ও জনবক্তৃতায় সামরিক হস্তক্ষেপের বিষয়টি ক্রমশ স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে আলোচনায় উঠে আসছে।

কিউবার অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সংকট, তীব্র গণবিক্ষোভ এবং ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে মার্কিন নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন তীব্র চাপ সৃষ্টি বা সীমিত হস্তক্ষেপের মতো বহুমুখী বিকল্প উন্মুক্ত হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা যেমন, ভোটারদের যুদ্ধবিমুখতা, অর্থনৈতিক চাপ, অভিবাসন সমস্যা এবং ফ্লোরিডার রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণে ট্রাম্প প্রশাসন সরাসরি সামরিক সংঘাত এড়িয়ে চলতে চাইছে। পরিবর্তে, তারা কিউবার ওপর নিয়ন্ত্রিত চাপ, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক হস্তক্ষেপ এবং কৌশলগত অস্পষ্টতার নীতি বজায় রাখছে।

অন্যদিকে, কিউবায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি ব্লুপ্রিন্ট বা ‘এন্ডগেম’ নিয়ে এক ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন জার্মান থিংক ট্যাংক এসডব্লিউপির গবেষক ক্লডিয়া জিলা। ২০২৬ সালের এপ্রিলের এক প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্র মূলত অর্থনৈতিক অবরোধ, জবরদস্তি এবং কিউবার বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর উচ্চমহলের সাথে আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন আনতে চায়।

তবে এই প্রক্রিয়ায় তারা কিউবার গণতান্ত্রিক শক্তির চেয়ে বর্তমান ক্ষমতাসীন অভিজাতদের প্রাধান্য দিচ্ছে, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বলয়ের অধীনে কিউবায় একটি কর্তৃত্ববাদী কাঠামোই টিকে থাকতে পারে। তবে এই ধরনের মার্কিন হস্তক্ষেপ কিউবার ভবিষ্যৎ সংকট মোচন করতে পারবে না বলে সতর্ক করেছেন গবেষক মাইকেল বুস্তামান্তে। তিনি জানান, বহু কিউবান নাগরিক মার্কিন হস্তক্ষেপ সমর্থন করলেও দীর্ঘদিনের মেরুকরণ ও একনায়কতান্ত্রিক শাসনের পর সেখানে নতুন করে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং সামাজিক বৈষম্য দূর করার মতো জটিল অভ্যন্তরীণ সমস্যার সমাধান মার্কিন সামরিক শক্তি দিয়ে সম্ভব নয়। এখন কিউবার জনগণকে বেছে নিতে হবে তারা মার্কিন পুতুল রাষ্ট্র হবে, নাকি নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেবে।

অবশেষে, কিউবা ও ভেনেজুয়েলার ওপর মার্কিন এই আগ্রাসী নীতির পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ‘জ্বালানি রাজনীতি’কে দায়ী করেছেন ভারতের ‘এমপি-আইডিএসএ’ -এর গবেষক সৌরভ মিশ্র। ২০২৬ সালের এপ্রিলের এক প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ভিন্ন ভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন অজুহাত তৈরি করছে, যেমন ভেনেজুয়েলায় মাদকপাচার, ইরানে পারমাণবিক ঝুঁকি এবং কিউবায় শত্রুভাবাপন্ন বিদেশি শক্তির উপস্থিতি। তবে এই সমস্ত প্রচারণার মূল উদ্দেশ্য হলো দেশগুলোর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি খাতকে মার্কিন নিয়ন্ত্রণের জন্য উন্মুক্ত করা এবং সেখানে চীন ও রাশিয়ার প্রভাব খর্ব করা। তিনি দাবি করেন, ভেনেজুয়েলা এবং ইরান কোনো তাৎক্ষণিক সামরিক হুমকি না থাকা সত্ত্বেও মার্কিন আক্রমণের শিকার হয়েছে। ঠিক একইভাবে, কিউবাকে এতকাল কেবল নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত রাষ্ট্র হিসেবে রাখা হলেও, দেশটির অফশোর তেল বা সমুদ্রবক্ষের বিপুল জ্বালানি সম্ভাবনা এবং চীন-রাশিয়ার সাথে সম্পর্কের কারণে একে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি জাতীয় জরুরি অবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। মূলত পশ্চিম গোলার্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন জ্বালানি আধিপত্য নিশ্চিত করাই ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য।

সূত্র: এশিয়া টাইমস 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here