ইরান যুদ্ধ থেকে শত শত কোটি ডলার মুনাফা করছে যারা

0
ইরান যুদ্ধ থেকে শত শত কোটি ডলার মুনাফা করছে যারা

ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। যখন বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ এই যুদ্ধের ফলে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি আর জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপে পিষ্ট হচ্ছে, তখন হাতেগোনা কিছু বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এই অস্থিরতাকে পুঁজি করে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার মুনাফা ঘরে তুলছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিতিশীলতা এবং হরমুজ প্রণালীর কার্যত অচলাবস্থা জ্বালানি তেলের বাজারে যে তীব্র দোদুল্যমানতা তৈরি করেছে, তা সাধারণ মানুষের পকেট কাটলেও নির্দিষ্ট কিছু কর্পোরেট জায়ান্টের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপ ও আমেরিকার জ্বালানি কোম্পানিগুলো এই সময়ে তাদের ব্যবসার ইতিহাসে অন্যতম সেরা সময় পার করছে।

তেল ও গ্যাস খাতের দিকে তাকালে দেখা যায়, যুদ্ধের কারণে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। ব্রিটিশ জ্বালানি জায়ান্ট বিপি চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই প্রায় ৩.২ বিলিয়ন ডলার মুনাফা করেছে, যা তাদের গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। একইভাবে শেলের মুনাফা ৬.৯ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা বাজার বিশ্লেষকদের সকল পূর্বাভাসকে ভুল প্রমাণ করেছে। ফরাসি কোম্পানি টোটাল এনার্জিসও এই বাজারে অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে তাদের মুনাফা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বাড়িয়ে নিয়েছে। যদিও সরবরাহ সংকটের কারণে মার্কিন জায়ান্ট এক্সন-মোবিল বা শেভরনের আয় কিছুটা কমেছে, তবুও তেলের চড়া দামের কারণে তারা ভবিষ্যতে আরও বড় অঙ্কের মুনাফার প্রত্যাশা করছে।

জ্বালানি খাতের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ খাতও এই যুদ্ধের আবহে ফুলেফেঁপে উঠেছে। জেপি মরগানের মতো বৃহৎ ব্যাংকগুলো তাদের ট্রেডিং শাখা থেকে রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব আদায় করেছে, যা তাদের ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ত্রৈমাসিক মুনাফা অর্জনে সহায়তা করেছে। গোল্ডম্যান স্যাকস এবং মরগান স্ট্যানলির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো দেখেছে যে, বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি এড়াতে তাদের সম্পদ নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিচ্ছে। ফলে লেনদেনের পরিমাণ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। বাজারের এই অস্বাভাবিক অস্থিরতা এবং বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কই মূলত ব্যাংকগুলোর জন্য বিপুল কমিশন ও মুনাফার পথ প্রশস্ত করে দিয়েছে।

যেকোনো যুদ্ধের সবচেয়ে বড় এবং প্রত্যক্ষ সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত প্রতিরক্ষা খাত এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। পশ্চিমা দেশগুলো তাদের অস্ত্রের মজুদ পূরণ করতে এবং আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও ড্রোন প্রযুক্তি গড়ে তুলতে মরিয়া হয়ে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কিনছে। বিএই সিস্টেমস এবং লকহিড মার্টিনের মতো কোম্পানিগুলো তাদের অর্ডারের তালিকায় নতুন নতুন সরকারি চাহিদা যুক্ত হতে দেখছে। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার অভাব অনুভব করে ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলো যেভাবে সামরিক বাজেট বাড়াচ্ছে, তাতে এই কোম্পানিগুলোর মুনাফার গ্রাফ শুধু উপরের দিকেই উঠছে। বোয়িং এবং নর্থরপ গ্রাম্যান-এর মতো ঠিকাদাররা এখন তাদের কারখানায় কাজের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।

তবে অদ্ভুত বিষয় হলো, এই যুদ্ধ জীবাশ্ম জ্বালানির পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের প্রসারেও এক অভাবনীয় ভূমিকা রাখছে। আমদানিকৃত তেলের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে অনেক দেশই এখন সৌরশক্তি এবং বায়ু বিদ্যুতের দিকে দ্রুতগতিতে ঝুঁকছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের প্রতি মানুষের আগ্রহ কয়েকগুণ বেড়েছে। ডেনমার্কের ভেস্টাস এবং ওরস্টেডের মতো বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিমধ্যে তাদের আয়ে বড় ধরনের উল্লম্ফন লক্ষ্য করেছে। এই প্রবণতা প্রমাণ করে যে, জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নটি এখন কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং একটি জাতীয় প্রতিরক্ষা ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের বাজারেও এই যুদ্ধের পরোক্ষ প্রভাব বেশ স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করে গৃহস্থালি পর্যায়ে সৌর প্যানেল এবং হিট পাম্পের চাহিদা অভাবনীয় হারে বেড়ে গেছে। ব্রিটিশ কোম্পানি অক্টোপাস এনার্জি জানিয়েছে যে, ফেব্রুয়ারি মাসের পর থেকে তাদের সৌর প্যানেল বিক্রির হার প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মানুষ এখন বাজারের অস্থির জ্বালানি মূল্যের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের শক্তির উৎস নিজেরাই নিশ্চিত করতে চাইছে। একইভাবে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বাড়ায় ইলেকট্রিক বা বৈদ্যুতিক যানের চাহিদাও বাড়ছে, যার বড় একটি সুবিধা ভোগ করছে চীনা গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো।

এই সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বিচারে বলা যায়, যুদ্ধ একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের জীবনে দুর্ভোগ বয়ে আনে, অন্যদিকে তা নির্দিষ্ট কিছু শিল্পের জন্য অকল্পনীয় মুনাফার দুয়ার খুলে দেয়। শেয়ার বাজারের অস্থিতিশীলতা থেকে শুরু করে সামরিক সরঞ্জামের চাহিদা বৃদ্ধি; সবকিছুই বড় কর্পোরেশনগুলোর অনুকূলে কাজ করছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যতদিন পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে এই অস্থিরতা বজায় থাকবে, ততদিন জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা খাতের এই জয়জয়কার থামবে না। বরং সাধারণ ভোক্তাদের দীর্ঘমেয়াদী উচ্চ মূল্যের বোঝা বয়ে বেড়াতে হবে আর এই কোম্পানিগুলোর ব্যাংক ব্যালেন্স কেবল স্ফীত হবে।

২০২৬ সালের এই যুদ্ধকালীন অর্থনীতি বিশ্বকে একটি রূঢ় সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। একদিকে যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং অনিশ্চয়তা, আর অন্যদিকে পুঁজিবাদী বাজার ব্যবস্থার মুনাফা লাভের তীব্র প্রতিযোগিতা। যুদ্ধের দামামা যত জোরে বাজছে, বৈশ্বিক কর্পোরেট দুনিয়ার মুনাফার কলকবজাও তত দ্রুত ঘুরছে। সাধারণ মানুষ যখন শান্তির প্রার্থনা করছে, তখন বড় কোম্পানিগুলো তাদের পরবর্তী ত্রৈমাসিক আয়ের হিসাব কষতে ব্যস্ত। এই বৈপরীত্যই বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থার এক নগ্ন চিত্র তুলে ধরেছে যেখানে ধ্বংসের মাঝেও কেউ কেউ খুঁজে পায় কোটি কোটি ডলারের সম্পদ।

সূত্র: বিবিসি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here