উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল এবং ইরানের হামলায় তেল স্থাপনা ও জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর মহাকাশ থেকে একাধিক তেল নিঃসরণের ঘটনা দেখা যাচ্ছে। এর ফলে বিশেষজ্ঞরা পরিবেশগত বিপর্যয়ের বিষয়ে সতর্ক করেছেন।
স্যাটেলাইট চিত্রগুলো এই অঞ্চলের ধ্বংসযজ্ঞের একটি চিত্র তুলে ধরেছে, যার মধ্যে পারস্য উপসাগরের ভঙ্গুর জীববৈচিত্র্যও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সেখানে ছড়িয়ে পড়া তেল উপসাগরীয় উপকূলবর্তী অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকার পাশাপাশি এই অঞ্চলের সমৃদ্ধ সামুদ্রিক জীবনকেও প্রভাবিত করতে পারে।
গত ৭ এপ্রিল তোলা একটি ছবিতে ইরানের কেশম দ্বীপের কাছে হরমুজ প্রণালীতে পাঁচ মাইলেরও বেশি এলাকাজুড়ে তেল নিঃসরণের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে।
গ্রিনপিস জার্মানির মুখপাত্র নিনা নোয়েল সিএনএন-কে জানিয়েছেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন বাহিনী একটি ইরানি জাহাজ, শহীদ বাঘেরি, আক্রমণ করার পর একই এলাকায় জাহাজটি থেকে তেল চুইয়ে পড়ে।
আরেকটি ছবিতে লাভান দ্বীপের চারপাশে তেল দেখা যাচ্ছে, যা ৭ এপ্রিল দ্বীপটির উপকূলের কাছে একটি তেল স্থাপনায় ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের ভাষায় ‘শত্রুদের’ হামলার ফল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করা এবং সিএনএন দ্বারা ভূ-অবস্থান নির্ণয় করা একটি ভিডিওতে ইরানের তেল শোধনাগার থেকে একটি বড় অগ্নিকাণ্ডের দৃশ্যও দেখা যায়।
লাভানে এই হামলা একটি ‘বড় ধরনের পরিবেশগত জরুরি অবস্থা,’ বলেছেন ডাচ শান্তি সংস্থা প্যাক্স-এর প্রকল্প নেতা উইম জুইনেনবার্গ, যিনি উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলার পরিণতি পর্যবেক্ষণ করেন।
তিনি আরও যোগ করেন, “লাভানের অন্তত পাঁচটি স্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে দ্বীপের চারপাশে তেল ছড়িয়ে পড়ছে এবং সমুদ্রে তেল চুইয়ে পড়ছে, তিনি সিএনএন-কে জানান। এই তেল এখন শিডভার দ্বীপেও পৌঁছাচ্ছে… যা একটি সংরক্ষিত এলাকা। এটি জনবসতিহীন, কিন্তু সেখানে বিভিন্ন সংরক্ষিত প্রজাতির প্রাণী রয়েছে।”
শিডভার দ্বীপ হলো পারস্য উপসাগরের একটি প্রবাল দ্বীপ, যা লাভান দ্বীপের প্রায় এক মাইল পূর্বে অবস্থিত এবং কচ্ছপ ও সামুদ্রিক পাখিসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীতে সমৃদ্ধ।
স্যাটেলাইট চিত্রে ৬ এপ্রিল কুয়েতের উপকূলের কাছেও তেল ছড়িয়ে পড়ার দৃশ্য দেখা গেছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর জানিয়েছে, দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানের একটি পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সে হামলার প্রতিশোধ হিসেবে তারা সেদিন কুয়েতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে জ্বালানি ও পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছে।
জুইনেনবার্গ সতর্ক করে বলেছেন, সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে, এই তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা হাজার হাজার মানুষের জন্য পরিণতি ডেকে আনতে পারে, বিশেষ করে ইরানের উপকূলবর্তী অঞ্চলের বাসিন্দাদের জন্য। এর মধ্যে রয়েছে- তাদের আয় ও খাদ্যের জন্য অপরিহার্য মাছ দূষিত হয়ে যাওয়া।
এই তেল ছড়িয়ে পড়া অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর জন্যও হুমকি, যেমন- কচ্ছপ, ডলফিন এবং তিমি, যারা তেল খেয়ে ফেলতে পারে বা এর মধ্যে আটকা পড়তে পারে। এটি লবণাক্ত পানি পরিশোধন কেন্দ্রের ফিল্টারিং সিস্টেমকেও প্রভাবিত করতে পারে, যার ওপর এই অঞ্চলের প্রায় ১০ কোটি মানুষ বিশুদ্ধ পানির জন্য নির্ভর করে।
এই পর্যায়ে, এই তেল ছড়িয়ে পড়ার ফলে কী পরিমাণ ক্ষতি হতে পারে তা সঠিকভাবে নির্ণয় করা কঠিন, তবে একটি পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে, বিশেষ করে যদি আরও জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গ্রিনপিস জার্মানির তথ্যানুযায়ী, উপসাগরে আনুমানিক ৭৫টি বড় তেলবাহী ট্যাংকার রয়েছে, যেগুলোতে মোট প্রায় ১৯ বিলিয়ন লিটার অপরিশোধিত তেল আছে।
গ্রিনপিসের নোয়েল বলেন, “তেল ছড়িয়ে পড়ার ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব থাকতে পারে, যা অণুজীব থেকে শুরু করে ম্যানগ্রোভ আবাসস্থলের উপর নির্ভরশীল মাছ, পাখি এবং সামুদ্রিক কচ্ছপ পর্যন্ত সমগ্র বাস্তুতন্ত্রকে প্রভাবিত করে।”
তিনি বলেন, ‘কাঠামোগত জটিলতা, সীমিত প্রবেশাধিকার এবং প্রতিকূল কর্মপরিবেশের’ কারণে এগুলো পরিষ্কার করা অত্যন্ত কঠিন।
তিনি আরও বলেন, চলমান সংঘাত উপসাগরে প্রবেশাধিকার পেয়ে তা পরিষ্কার করার সম্ভাবনাকে প্রায় অসম্ভব করে তুলেছে। সূত্র: সিএনএন

