ইরানের হাতে কোনো কার্যকর পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র না থাকলেও দেশটির হাতে রয়েছে এমন এক কৌশলগত শক্তি যা যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। তেহরান প্রমাণ করে দিয়েছে, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ ‘হরমুজ প্রণালী’র ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ মূলত একটি ভৌগোলিক পারমাণবিক বোমার সমান।
বর্তমান মার্কিন-ইসরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে যে, তেহরানের এই ‘অদৃশ্য পারমাণবিক অস্ত্র’ বিশ্ব অর্থনীতিকে কতটা পঙ্গু করে দিতে পারে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে পশ্চিমাবিশ্ব ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করলেও আদতে প্রণালীর এই নিয়ন্ত্রণই ইরানের প্রধান প্রতিরক্ষা বর্ম হিসেবে কাজ করছে।
হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের মোট সমুদ্রজাত অপরিশোধিত তেল ও গ্যাসের প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পরিবহণ করা হয়। যুদ্ধের শুরুতেই ইরান এই পথে জাহাজ চলাচল সীমিত করে দেওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বেড়ে ব্যারেল প্রতি ১১০ ডলারের গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে। এর ফলে এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলোতে জ্বালানি সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে ভারত, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপানের মতো বড় অর্থনীতির দেশগুলো যারা এই রুটের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, তারা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। এমনকি বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মতো দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতেও জ্বালানি রেশনিং করতে হচ্ছে যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যাপক প্রভাব ফেলছে।
মার্কিন অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, এই যুদ্ধের ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হতে পারে। এমনকি মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকার কারণে বৈশ্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে ক্রমাগত হুমকি দিলেও ইরান তার অবস্থানে অনড় থেকেছে। এই পরিস্থিতি হোয়াইট হাউসকে চরম চাপে ফেলে দিয়েছে, কারণ নিজ দেশে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি আগামী নির্বাচনে বর্তমান প্রশাসনের জন্য বড় ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভৌগোলিক দিক থেকে হরমুজ প্রণালী মাত্র ৩৩ কিলোমিটার চওড়া এবং এর গুরুত্বপূর্ণ জাহাজ চলাচলের পথটি ইরানের উপকূলীয় সীমানার মধ্যেই পড়ে। ইরান জাতিসংঘ সমুদ্র আইন কনভেনশনে স্বাক্ষর না করায় তারা দাবি করছে, এই জলপথের ওপর তাদের পূর্ণ সার্বভৌম কর্তৃত্ব রয়েছে। এমনকি যুদ্ধের পর শান্তি আলোচনা শুরু হলেও ইরান এখন প্রতিটি জাহাজ থেকে মোটা অঙ্কের টোল আদায়ের দাবি তুলছে।
সূত্র: এনডিটিভি

