অকার্যকর বলে কটাক্ষ, এখন সেই জাতিসংঘের কাছেই কেন সহায়তা চাইছেন ট্রাম্প?

0
অকার্যকর বলে কটাক্ষ, এখন সেই জাতিসংঘের কাছেই কেন সহায়তা চাইছেন ট্রাম্প?

হরমুজ প্রণালী ঘিরে চলমান উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের আশঙ্কার মধ্যে এবার জাতিসংঘের সহায়তা চেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অথচ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই ওয়াশিংটন ধারাবাহিকভাবে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করার অবস্থান নিয়েছিল। ফলে প্রশ্ন উঠেছে- যে প্রতিষ্ঠানকে এতদিন অকার্যকর বলে সমালোচনা করা হয়েছে, এখন সংকট মোকাবিলায় সেই জাতিসংঘের কাছেই কেন ফিরছে যুক্তরাষ্ট্র?

মঙ্গলবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সাংবাদিকদের বলেন, ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে জাতিসংঘের ভূমিকা জরুরি। তার ভাষায়, “ইরান যেন জাহাজে হামলা বন্ধ করে, মাইন সরিয়ে নেয় এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে মানবিক সহায়তা প্রবেশের সুযোগ দেয়- সেজন্য আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োজন।”

একই দিনে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের উত্থাপিত একটি খসড়া প্রস্তাব নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক শুরু হয়। বাহরাইন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও কাতারের সমর্থনে আনা এ প্রস্তাব পাস হলে ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের পথও খুলে যেতে পারে।

বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিয়মিত পরিবাহিত হয়। কিন্তু যুদ্ধের জেরে প্রণালীটি অচল হয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে গেছে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

জাতিসংঘ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান
দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ট্রাম্প প্রশাসন জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প প্রশ্ন তুলেছিলেন, “জাতিসংঘের উদ্দেশ্যই বা কী?”

তিনি তখন বলেন, “জাতিসংঘের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে, কিন্তু তারা সেই সম্ভাবনার ধারেকাছেও যেতে পারেনি।”

একই ভাষণে ট্রাম্প দাবি করেন, তার প্রশাসন জাতিসংঘের কোনও সহায়তা ছাড়াই ‘সাতটি শেষ না হওয়া যুদ্ধ’ বন্ধ করেছে। এমনকি চলতি বছরের জানুয়ারিতে গাজা যুদ্ধ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গঠিত তথাকথিত ‘বোর্ড অব পিস’ নিয়ে এক সাংবাদিক জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, এটি ভবিষ্যতে জাতিসংঘের বিকল্পও হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, এতদিন এককভাবে কূটনৈতিক ও সামরিক চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করলেও হরমুজ সংকটে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না পাওয়ায় এখন আন্তর্জাতিক বৈধতা অর্জনের জন্য জাতিসংঘকে ব্যবহার করতে চাইছে ওয়াশিংটন।

নতুন প্রস্তাবে কী রয়েছে?
যুক্তরাষ্ট্র ও তার উপসাগরীয় মিত্রদের উত্থাপিত খসড়া প্রস্তাবে ইরানকে জাহাজে হামলা বন্ধ, ‘অবৈধ টোল’ আরোপ বন্ধ এবং সমুদ্রপথে স্থাপন করা মাইনের অবস্থান প্রকাশ করার দাবি জানানো হয়েছে।

এতে আরও বলা হয়েছে, জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে হরমুজ প্রণালী দিয়ে মানবিক সহায়তা, সার ও অন্যান্য জরুরি পণ্য পরিবহনের জন্য একটি নিরাপদ করিডর তৈরিতে ইরানকে সহযোগিতা করতে হবে।

এটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় উদ্যোগ। এর আগে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার লক্ষ্যে আনা আরেকটি প্রস্তাব চীন ও রাশিয়ার ভেটোতে বাতিল হয়ে যায়। সেই প্রস্তাবে সামরিক শক্তি ব্যবহারের পথ সুস্পষ্টভাবে রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে।

নতুন খসড়ায় সরাসরি সামরিক অভিযান অনুমোদনের কথা উল্লেখ না থাকলেও এটি জাতিসংঘ সনদের সপ্তম অধ্যায়ের আওতায় আনা হয়েছে। এই অধ্যায়ের অধীনে নিরাপত্তা পরিষদ নিষেধাজ্ঞা থেকে শুরু করে সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ পর্যন্ত নানা পদক্ষেপ অনুমোদন করতে পারে।

রুবিও বলেন, “এটি জাতিসংঘের কার্যকারিতার একটি বড় পরীক্ষা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি এত সরল একটি বিষয়েও একমত হতে না পারে, তাহলে জাতিসংঘ ব্যবস্থার উপযোগিতা কোথায়?”

তবে তিনি স্বীকার করেন, যুক্তরাষ্ট্র খসড়ার ভাষায় কিছু পরিবর্তন আনলেও সেটি চীন ও রাশিয়ার ভেটো ঠেকাতে যথেষ্ট হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

চীন-রাশিয়ার অবস্থান কী?
খসড়া প্রস্তাবটি মঙ্গলবার বিকালে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে চীনের জাতিসংঘ মিশন জানিয়েছে, তারা এখনও প্রস্তাবটি মূল্যায়ন করছে।

অন্যদিকে রাশিয়ার জাতিসংঘ মিশন তাৎক্ষণিকভাবে কোনও মন্তব্য করেনি।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ওয়াশিংটন দ্রুত আলোচনা শেষ করে শুক্রবারের মধ্যে চূড়ান্ত খসড়া উত্থাপন এবং আগামী সপ্তাহের শুরুতে ভোট আয়োজন করতে চায়। তবে চীন ও রাশিয়ার পক্ষ থেকেও বিকল্প একটি প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে।

বৈশ্বিক রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে চলমান সংকট এখন শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ইস্যু নয়; এটি আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং জাতিসংঘের ভবিষ্যৎ ভূমিকাকেও নতুনভাবে সামনে এনেছে।

একদিকে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সমর্থন নিয়ে ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে চাইছে, অন্যদিকে চীন ও রাশিয়া পশ্চিমা প্রভাব মোকাবিলায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে। ফলে নিরাপত্তা পরিষদে এই প্রস্তাব ঘিরে নতুন করে বড় শক্তিগুলোর কূটনৈতিক সংঘাত তীব্র হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সূত্র: আল-জাজিরা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here