যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক অভিযানে নিজেদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত রক্ষা করতে ইরান ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে বলে দাবি করেছে মার্কিন গোয়েন্দা সূত্র। দেশটি ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ ধসিয়ে দিয়েছে এবং প্রবেশপথে বিস্ফোরক মাইন বসিয়ে দিয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে জানিয়েছে একাধিক সূত্র।
যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য সম্পর্কে অবগত পাঁচটি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গত কয়েক সপ্তাহে ইরান তার প্রায় বোমা তৈরির উপযোগী মাত্রার কাছাকাছি থাকা ইউরেনিয়াম মজুতকে আরও সুরক্ষিত করতে এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
সূত্রগুলোর দাবি, প্রায় আধা টন উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন, ঝুঁকিপূর্ণ এবং সময়সাপেক্ষ উপায়ে উদ্ধারযোগ্য হয়ে উঠেছে। মাত্র এক মাস আগেও পরিস্থিতি এতটা জটিল ছিল না, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনে সামরিক অভিযান চালিয়ে ওই উপাদান নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে।
ইরানের নেওয়া নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থা ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তির ক্ষেত্রেও নতুন জটিলতা তৈরি করেছে। কারণ আলোচনায় থাকা অন্যতম প্রধান বিষয় হলো ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণ ও ধ্বংস করা। এখন প্রশ্ন উঠেছে- এত ঝুঁকিপূর্ণ উদ্ধার অভিযান কে পরিচালনা করবে এবং কীভাবে তা সম্পন্ন হবে।
ইরানের জাতিসংঘ মিশনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনও মন্তব্য পাওয়া যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসও এ বিষয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
চুক্তির কেন্দ্রে ইউরেনিয়াম অপসারণ
ইরানের সঙ্গে চলমান আলোচনায় ট্রাম্প প্রশাসন বারবার বলেছে, দেশটির উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া তাদের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।
হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ এবং চলমান সংঘাত বন্ধের লক্ষ্যে যে সম্ভাব্য সমঝোতার আলোচনা চলছে, সেখানে ইউরেনিয়াম অপসারণ একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে উঠে এসেছে।
মার্কিন প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা শুক্রবার সাংবাদিকদের জানান, দুই পক্ষ একটি সম্ভাব্য চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছে। ওই চুক্তি অনুযায়ী ইরান তার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করবে। এরপর তা ঘটনাস্থলেই ধ্বংস করা হবে এবং পরে দেশের বাইরে সরিয়ে নেওয়া হবে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা সম্ভাব্য চুক্তির শর্ত নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিচ্ছেন। ফলে প্রকৃত সমঝোতার বিস্তারিত এখনও স্পষ্ট নয়।
উদ্ধার অভিযান হবে অত্যন্ত কঠিন
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে ইউরেনিয়াম উদ্ধার করা এখন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল নিউক্লিয়ার সিকিউরিটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের সাবেক কর্মকর্তা স্কট রোকার বলেন, যদি সত্যিই এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উদ্ধার করা আরও জটিল হয়ে যাবে।
তার মতে, ভূগর্ভস্থ ধসে পড়া সুড়ঙ্গ থেকে এই উপাদান বের করতে ভারী খনন যন্ত্র, বিস্ফোরক অপসারণ এবং বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রয়োজন হবে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ইরান ভবিষ্যতে দাবি করতে পারে যে ইউরেনিয়ামের কিছু অংশ উদ্ধারযোগ্য নয়। এতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের পক্ষে নিশ্চিত হওয়া কঠিন হবে যে দেশটি পুরো মজুত হস্তান্তর করেছে কি না।
কোথায় রয়েছে ইরানের ইউরেনিয়াম?
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ধারণা, ইরানের অধিকাংশ উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মধ্য ইরানের ইসফাহান পারমাণবিক স্থাপনার ভূগর্ভস্থ ধসে পড়া সুড়ঙ্গে রয়েছে। এছাড়া কিছু অংশ অন্য স্থানেও সংরক্ষিত থাকতে পারে।
এর আগে মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে মার্কিন সামরিক বাহিনী ওই পারমাণবিক উপাদান দখলে নেওয়ার সম্ভাব্য অভিযান নিয়ে প্রস্তুতি নিয়েছিল বলে জানা যায়। তবে পরে সেটিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনা করে বাতিল করা হয়।
এর পর থেকেই ইরান ওই স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা আরও জোরদার করেছে বলে গোয়েন্দা সূত্রগুলো দাবি করছে।
ট্রাম্পের প্রকাশ্য মন্তব্য কি ইরানকে সতর্ক করেছে?
ট্রাম্প এর আগে স্বীকার করেছিলেন, সামরিক শক্তি ব্যবহার করে ইউরেনিয়াম উদ্ধার করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
মে মাসে ফক্স নিউজে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র জানে কোথায় ওই উপাদান রয়েছে এবং ইরানের পক্ষে মার্কিন গোয়েন্দা নজরদারি এড়িয়ে তা উদ্ধার করা কঠিন।
ট্রাম্প বলেছিলেন, “আমরা ঠিক জানি সেখানে কী ঘটছে। কেউ এর কাছাকাছিও যেতে পারেনি।”
তবে দুই গোয়েন্দা সূত্রের মতে, প্রেসিডেন্টের প্রকাশ্য বক্তব্য ইরানকে তাদের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো আরও সুরক্ষিত করার সুযোগ করে দিতে পারে।
চুক্তি হলেও থাকবে প্রযুক্তিগত জটিলতা
যদি আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা হয়, তবুও পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও দীর্ঘ প্রযুক্তিগত আলোচনা প্রয়োজন হবে।
ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে সরিয়ে নিতে যুক্তরাষ্ট্রের ওক রিজ ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির অধীনে পরিচালিত বিশেষায়িত মোবাইল ইউরেনিয়াম ব্যবস্থাপনা ইউনিট মোতায়েনের প্রয়োজন হতে পারে।
এর আগে জানা যায়, ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ আলোচক জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফ ওই গবেষণাগার পরিদর্শন করেছিলেন।
তবে বিশ্বের সবচেয়ে দক্ষ পারমাণবিক উপাদান অপসারণ বিশেষজ্ঞদেরও এই কাজ শেষ করতে যথেষ্ট সময় লাগবে। ট্রাম্প নিজেই এর আগে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে অন্তত দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ইউরেনিয়াম মজুত অপসারণের বিষয়টি এখন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার সবচেয়ে কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। সূত্র: সিএনএন

