রূপচর্চার গোলকধাঁধায় কেন হারাচ্ছে কোমলমতি শিশুরা?

0
রূপচর্চার গোলকধাঁধায় কেন হারাচ্ছে কোমলমতি শিশুরা?

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের স্ক্রিনে ভেসে উঠছে ১০-১২ বছরের এক শিশুর হাসিমুখ। তবে তার কথা বা আচরণে শৈশবের সারল্য নেই বরং সে ব্যস্ত প্রাপ্তবয়স্কদের মতো ত্বকের যত্নের রুটিন দেখাতে। ফেসিয়াল টোনার, সিরাম, ময়েশ্চারাইজার আর ফেস মিস্টের একের পর এক প্রলেপ মাখছে নিজের নরম ত্বকে। টিকটক কিংবা ইনস্টাগ্রামের কল্যাণে আজকের দিনে এটি আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। তথাকথিত ‘গেট রেডি উইথ মি’ (সাজগোজের) এই ভিডিওগুলো বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ শিশুর প্রাত্যহিক জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে, যা কোমলমতি মেয়েদের ঠেলে দিচ্ছে এক বিপজ্জনক গোলকধাঁধায়।

অতীতে রূপচর্চার বিজ্ঞাপন বা পণ্যগুলো মূলত কিশোরী বা তরুণীদের লক্ষ্য করে তৈরি হতো, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্রন বা ত্বকের দাগ দূর করা। কিন্তু বর্তমান চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন একেবারে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুরা অ্যান্টি-এজিংয়ের (বয়সের ছাপ দূর করার) জটিল সব প্রসাধনী ব্যবহার করছে নিখুঁত ও উজ্জ্বল ত্বকের আশায়। পশ্চিমা দেশগুলোতে এই প্রবণতা এতটাই মহামারি আকার ধারণ করেছে যে, আট-নয় বছরের শিশুরাই এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন নামী বিউটি ব্র্যান্ডের দূত হিসেবে কাজ করছে। এই কনটেন্ট ক্রিয়েশন (ভিডিও তৈরি) এখন অনেকের পরিবারের উপার্জনের মূল উৎসে পরিণত হয়েছে।

মনোবিজ্ঞানী এবং চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা শিশুদের এই প্রসাধনী-আসক্তিকে একটি বড় মানসিক ও শারীরিক ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত করছেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হচ্ছে ‘কসমেটিকোরেক্সিয়া’। চিকিৎসকদের মতে, এই সমস্যায় আক্রান্ত শিশুরা দিন-রাত মোবাইল ফোনে মগ্ন থাকে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় স্কিনকেয়ার ভিডিও দেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটায়। অবস্থা এতটাই গুরুতর যে, অনেকে দৈনিক ১০টিরও বেশি রূপচর্চার পণ্য ব্যবহার করে এবং মেকআপ ছাড়া পরিবার কিংবা বন্ধুদের সামনে আসতেও অস্বীকৃতি জানায়। শৈশবের স্বাভাবিক সামাজিকীকরণকে হটিয়ে সেখানে জায়গা করে নিচ্ছে কৃত্রিম সৌন্দর্যের মোহ।

এই কোটি কোটি ডলারের প্রসাধনী শিল্পের আগ্রাসনে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিভিন্ন দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থাও। ইউরোপের বাজারগুলোতে ইতিমধ্যেই বেশ কিছু নামি কসমেটিকস ব্র্যান্ডের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, তারা শিশুদের উপযোগী নয় এমন পণ্যগুলোকেও অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে প্রচ্ছন্ন বিপণন কৌশল ব্যবহার করছে। যুক্তরাজ্য ও ইতালির মতো দেশের বিজ্ঞাপন মানদণ্ড কর্তৃপক্ষও এই বিষয়ে নজরদারি বাড়িয়েছে। কারণ গবেষণায় দেখা গেছে, একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুর পেছনে প্রতি তিন-চার মাসে কেবল স্কিনকেয়ারের জন্যই বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করছেন অভিভাবকরা, যা এক ধরণের সামাজিক চাপ তৈরি করছে।

সবচেয়ে বড় পরিহাসের জায়গাটি হলো, শিশুদের যে বয়সে ত্বক প্রাকৃতিকভাবেই সবচেয়ে নিখুঁত ও প্রাণবন্ত থাকে, ঠিক সেই বয়সেই তারা কৃত্রিম উপায়ে ‘গ্লাস স্কিন’ পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠছে। চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, অ্যান্টি-এজিং ক্রিমগুলোতে এমন কিছু সক্রিয় উপাদান বা রাসায়নিক থাকে যা শিশুদের ত্বকের প্রাকৃতিক সুরক্ষা স্তরকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়। ফলে দিন দিন শিশুদের ত্বক সংবেদনশীল হয়ে পড়ছে এবং তারা অল্প বয়সেই একজিমা, মারাত্মক অ্যালার্জি ও অ্যাকনের মতো জটিলতায় আক্রান্ত হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাথার সামনের অংশের চুল পড়ে যাওয়ার মতো দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিও দেখা দিচ্ছে।

এই অন্ধ অনুকরণের পেছনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর অ্যালগরিদম এবং ফিল্টারের ব্যবহারকে দায়ী করছেন সমাজবিজ্ঞানীরা। টিকটক, মেটা বা স্ন্যাপচ্যাটের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অবাস্তব ফিল্টার ব্যবহার করে যে রূপ প্রদর্শন করা হয়, শিশুরা সেটাকেই জীবনের চরম সত্য বলে ধরে নিচ্ছে। ডিজিটাল পর্দার সেই নিখুঁত চেহারা যখন তারা বাস্তব জীবনের আয়নায় খুঁজে পায় না, তখন তাদের মধ্যে তীব্র হতাশা এবং হীনম্মন্যতার জন্ম নেয়। নিজেদের সুন্দর প্রমাণ করার এই অবাস্তব প্রতিযোগিতা শিশুদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে।

বিষয়টি নিয়ে অভিভাবক ও সমাজকর্মীদের মধ্যেও এক ধরণের অপরাধবোধ কাজ করছে। এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৪০ শতাংশ বাবা-মা স্বীকার করেছেন যে তারা তাদের সন্তানের চেয়ে স্কিনকেয়ারের উপাদান সম্পর্কে কম জানেন। অনেক অভিভাবক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সন্তানদের এই তারকাখ্যাতি এবং আর্থিক সচ্ছলতা দেখে আনন্দিত হলেও এর পেছনের অন্ধকার দিকটি বুঝতে ভুল করছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে বয়সে মাঠের খেলাধুলা বা পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়ার কথা, সেই বয়সে লাইক আর কমেন্টের সংখ্যার ওপর নিজের আত্মসম্মানকে সঁপে দেওয়া শিশুদের ভবিষ্যৎ মানসিক বিকাশের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ।

বিবিসির বিশ্লেষণ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here