আমেরিকা ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের মাঝেই বৈশ্বিক সাইবার যুদ্ধ আরও তীব্র করে তুলেছে ইরান। মার্কিন গোয়েন্দা ও সাইবার নিরাপত্তা গবেষকদের সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, ইরানের রাষ্ট্রীয় মদতপুষ্ট হ্যাকাররা অত্যন্ত সুকৌশলে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিমান পরিবহন, তেল এবং গ্যাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্য করে এক বিশাল গুপ্তচরবৃত্তি অভিযান শুরু করেছে। চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে এই সাইবার হামলাকে একটি বড় ধরনের কৌশলগত হুমকি হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানকে লক্ষ্য করে মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলার পর থেকেই এই ধরনের সাইবার হানার আশঙ্কা করা হচ্ছিল, যা এখন বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে।
নিয়োগকারীর ছদ্মবেশে কৌশলগত সাইবার হামলা
মার্কিন শীর্ষস্থানীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা পালো আল্টো নেটওয়ার্কসের বিশেষ গবেষণা শাখা ‘ইউনিট ৪২’ শুক্রবার এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করেছে। গবেষকরা জানিয়েছেন, ইরানি হ্যাকাররা মূলত ভুয়া চাকরির নিয়োগকারী বা রিক্রুটার সেজে বিমান চলাচল খাতের অত্যন্ত দক্ষ সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করছে। ছদ্মবেশ ধারণের এই বিস্তৃত ও সুনিপুণ পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো স্পর্শকাতর করপোরেট নেটওয়ার্কে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। এই বিশেষ হ্যাকিং অভিযানে আমেরিকার একটি শীর্ষ তেল ও গ্যাস কোম্পানি ছাড়াও ইসরায়েল এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাকে নিশানা করা হয়েছে বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিমান চলাচল কিংবা তেল-গ্যাস খাতের মতো অতি সংবেদনশীল পরিকাঠামো হ্যাক করতে পারলে ইরান এক বিশাল কৌশলগত সুবিধা পেয়ে যাবে। তাত্ত্বিকভাবে, বিমান সংস্থাগুলোর নেটওয়ার্কে প্রবেশ করতে পারলে বেইজিং বা তেহরানের পক্ষে মধ্যপ্রাচ্যগামী বিভিন্ন ফ্লাইটের যাত্রী বা মেনিফেস্টো ট্র্যাক করা অত্যন্ত সহজ হবে। একইসঙ্গে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের চলমান অস্থিরতার মধ্যে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে, তার অভ্যন্তরীণ কৌশলগত তথ্যও ইরানের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা একে একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক ‘অপ্রতিসম হুমকি’ বা অ্যাসিম্যাট্রিক থ্রেট হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
সাইবার গুপ্তচরবৃত্তিতে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার
এই সাইবার গুপ্তচরবৃত্তির জন্য ইরানি অপারেটিভরা অত্যন্ত চতুর পদ্ধতি অবলম্বন করেছে। তারা প্রথমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিখুঁত এবং পেশাদারী ভাষায় মার্কিন এয়ারলাইনসের ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি তৈরি করে। চাকরিপ্রার্থীদের আকর্ষণ করতে তারা এমন সব করপোরেট ভাষা ব্যবহার করে, যা সাধারণত আমেরিকার বড় কোম্পানিগুলোর বিজ্ঞাপনে দেখা যায়। এরপর আগ্রহী সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে ভুয়া ভিডিও কনফারেন্সিং বা অনলাইন ইন্টারভিউয়ের আয়োজন করা হয়। এই ভিডিও কনফারেন্সের জন্য ব্যবহৃত সফটওয়্যারের ভেতরেই হ্যাকাররা অত্যন্ত ক্ষতিকারক ম্যালওয়্যার বা ক্ষতিকর কোড লুকিয়ে রাখে, যা ডাউনলোড করলেই ব্যবহারকারীর পুরো কম্পিউটার হ্যাকারদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
পালো আল্টো নেটওয়ার্কসের গবেষকরা অবশ্য আশ্বস্ত করেছেন যে, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী হ্যাকাররা মার্কিন বা ইসরায়েলি তেল ও বিমান সংস্থাগুলোর মূল নেটওয়ার্ক পুরোপুরি ভাঙতে বা সফলভাবে অনুপ্রবেশ করতে পারেনি। তবে এই বৈশ্বিক হ্যাকিং অভিযানের মাধ্যমে অন্যান্য বেশ কিছু আন্তর্জাতিক লক্ষ্যবস্তুর নিরাপত্তা প্রাচীর ভেঙে তারা ভেতরে ঢুকতে সক্ষম হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কৌশলগত নিরাপত্তার স্বার্থে সাইবার গবেষকরা সেই ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম বা পরিচয় প্রকাশ করতে সায় দেননি। এই হ্যাকিং প্রতিরোধে মার্কিন ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা এফবিআই-এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা এই মুহূর্তে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
মার্কিন তেলের ট্যাংকের রিডারে রহস্যময় ডিজিটাল অনুপ্রবেশ
ইরানের কাছে আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানার মতো দূরপাল্লার শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন না থাকায়, তারা মার্কিন আইটি ও স্পর্শকাতর অবকাঠামোতে সাইবার অনুপ্রবেশের পথ বেছে নিয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দারাও যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইরানের এই ধরনের গোপন সাইবার তৎপরতার ওপর কড়া নজর রাখছিলেন। এর আগে গত সপ্তাহে মার্কিন গ্যাস স্টেশনগুলোর তেলের ট্যাংকের রিডারে রহস্যময় ডিজিটাল অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেছিল, যা আমেরিকার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। মার্কিন সরকারি কর্মকর্তারা অত্যন্ত গোপনীয় সেই ঘটনার পেছনেও ইরানি হ্যাকারদের প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিমান সংস্থা, বিমানবন্দর এবং বিমান খাতের নিরাপত্তা তদারকিকারী বৈশ্বিক সংগঠন ‘এভিয়েশন ইনফরমেশন শেয়ারিং অ্যান্ড অ্যানালাইসিস সেন্টার’ অবশ্য এই ইরানি তৎপরতায় অবাক হয়নি। সংগঠনের প্রেসিডেন্ট জেফ্রি ট্রয় সিএনএন-কে এক সাক্ষাৎকারে জানান যে, যুদ্ধের শুরু থেকেই তারা এই ধরনের বড় মাত্রার সাইবার হামলার আশঙ্কা করছিলেন। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে তারা ইতোমধ্যেই তাদের সহযোগী সংস্থাগুলোকে সতর্ক করেছেন। তিনি আরও জানান যে, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ভুয়া আইটি কর্মী সেজে বা করপোরেট হেল্প ডেস্কগুলোর অপব্যবহার করে কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ পাসওয়ার্ড ও ক্রেডেনশিয়াল চুরি করার প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিমান পরিবহন খাতে ইরানি নজরদারির অতীত রেকর্ড
ঐতিহাসিকভাবেই ইরানের হ্যাকিং দলগুলোর বিমান চলাচল খাতের ওপর বিশেষ নজর রাখার এক দীর্ঘ রেকর্ড রয়েছে। অতীতেও তারা বিভিন্ন দেশের বিমান সংস্থার ডেটাবেজ হ্যাক করে বিদেশে অবস্থানরত ইরানি ভিন্নমতাবলম্বী ও রাজনৈতিক বিরোধীদের গতিবিধির ওপর নজরদারি করার চেষ্টা চালিয়েছে। চলমান বৈশ্বিক অভিযানে তারা মূলত প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে মূল্যবান কর্মীদের টার্গেট করছে, বিশেষ করে সেইসব সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের, যাদের কোম্পানির মূল নেটওয়ার্কের ভেতরে গভীর ও অবাধ প্রবেশাধিকার রয়েছে। উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের মতোই ইরানও এখন আমেরিকার উচ্চ-প্রযুক্তি খাতে নিজেদের ছদ্মবেশী কর্মী বা নিয়োগকারী হিসেবে অনুপ্রবেশ করানোর জন্য সমন্বিত প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর দাবি বনাম বাস্তবতা
চলমান যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতায় গত মার্চ মাসে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) দাবি করেছিল যে, তারা বিমান হামলার মাধ্যমে ইরানের মূল ‘সাইবার যুদ্ধ সদর দপ্তর’ বা একটি বিশেষ সামরিক কম্পাউন্ড ধ্বংস করে দিয়েছে। তবে সেই হামলায় ইরানের কতজন সাইবার যোদ্ধা বা আইটি বিশেষজ্ঞ নিহত হয়েছেন, তা তখন সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি। ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে ইরানের সাইবার কমান্ডের কিছু অংশ সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, তাদের মূল হ্যাকিং দলগুলোর কার্যক্রম যে বিন্দুমাত্র স্তিমিত হয়নি, তা বর্তমান হ্যাকিংয়ের তীব্রতা থেকেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। যুদ্ধের মধ্যেও তারা তাদের অভিযানের গতি ও কার্যকারিতা পূর্ণ মাত্রায় বজায় রেখেছে।
পালো আল্টো নেটওয়ার্কসের ‘ইউনিট ৪২’-এর গবেষকরা শুক্রবার তাদের সমাপনী মূল্যায়নে বলেছেন যে, যুদ্ধ সত্ত্বেও ইরানি হ্যাকিং গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম ধিমিয়ে পড়ার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। বরং তারা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপের মুখে আরও বেশি আগ্রাসী হয়ে উঠেছে। নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং শত্রুপক্ষের রণকৌশল আগেভাগেই জেনে যাওয়ার তাগিদে তেহরান-সংযুক্ত হ্যাকাররা অত্যন্ত অভিযোজনক্ষম বা অ্যাডাপ্টিভ বৈশ্বিক সাইবার ক্যাম্পেইন পরিচালনা করে যাচ্ছে। এই সাইবার যুদ্ধ আগামী দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সংঘাতকে আরও জটিল এবং বহুমাত্রিক করে তুলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সূত্র: সিএনএন

