ইসরায়েলকে ইরানি হামলা থেকে রক্ষা করতে গিয়ে নিজেদের মজুদে থাকা উন্নত প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতকারী ইন্টারসেপ্টরের বিশাল অংশ শেষ করে ফেলেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে। সেখানে বলা হয়েছে, ইসরায়েল নিজের সুরক্ষায় যতগুলো ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি মার্কিন ইন্টারসেপ্টর খরচ করেছে পেন্টাগন। এই বিপুল খরচের কারণে বর্তমানে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সামরিক ব্যবস্থাপনাই বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চলাকালীন ইসরায়েলের আকাশে প্রতিরক্ষামূলক প্রাচীর গড়তে যুক্তরাষ্ট্র তাদের অত্যন্ত উন্নত থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ২০০টিরও বেশি ইন্টারসেপ্টর উৎক্ষেপণ করেছে, যা পেন্টাগনের মোট মজুদের প্রায় অর্ধেক। এর বাইরে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে মোতায়েন করা মার্কিন যুদ্ধজাহাজ থেকে আরও শতাধিক স্ট্যান্ডার্ড মিসাইল-৩ এবং স্ট্যান্ডার্ড মিসাইল-৬ ইন্টারসেপ্টর ছুড়েছে মার্কিন বাহিনী। এর বিপরীতে, ইসরায়েল নিজে তাদের সুরক্ষায় ১০০টিরও কম অ্যারো ইন্টারসেপ্টর এবং প্রায় ৯০টি ডেভিডস স্লিং ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করেছে। ওয়াশিংটন পোস্ট এই বৈসাদৃশ্যকে দুই দেশের সামরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি চরম ‘একপেশে সমীকরণ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
এই চরম ভারসাম্যহীনতার কারণে মার্কিন সামরিক বাহিনী এখন এক অভূতপূর্ব সংকটে পড়েছে। বর্তমানে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা চললেও, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন যে তার শর্ত মেনে না নিলে ইরানের ওপর আবারও হামলা শুরু হবে। কিন্তু সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এখন মাত্র ২০০টির মতো থাড ইন্টারসেপ্টর অবশিষ্ট রয়েছে, যা যেকোনো নতুন সংঘাতের মুখে আমেরিকাকে চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ফেলে দেবে।
মার্কিন থাড ক্ষেপণাস্ত্রের এই ঘাটতি নিয়ে এর আগেও গণমাধ্যমে খবর এলেও, ইসরায়েলকে বাঁচাতে গিয়ে পেন্টাগন নিজেদের এতটা উজাড় করে দিয়েছে তা এই প্রথম সামনে এলো। যুদ্ধ চলাকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্ররা যখন নিজেদের সুরক্ষায় ইন্টারসেপ্টর সরবরাহের অনুরোধ করেছিল, তখন পেন্টাগন তাদের ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল এই ঘাটতির কারণেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংঘাতের মূল কৌশলই ছিল এক পক্ষ কর্তৃক অন্য পক্ষের সমরাস্ত্রের মজুদ ফুরিয়ে দেওয়ার প্রতিযোগিতা। মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী চেষ্টা করেছিল ইরানের ভেতরেই তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও উৎক্ষেপণ যন্ত্রগুলো ধ্বংস করতে, অন্যদিকে ইরান চেয়েছিল নিজেদের মজুদ ধরে রেখে মার্কিন ও ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর ফুরিয়ে দিতে। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান এই কৌশলে বেশ সফল। যুদ্ধের পরও ইরানের কাছে এখনও তাদের আগের মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থার এবং মোট ক্ষেপণাস্ত্র মজুদের প্রায় ৭০ শতাংশ অক্ষত রয়েছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর একটি সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত। দীর্ঘদিনের যুদ্ধের পর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ইসরায়েল তাদের বেশ কিছু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যাটারি সাময়িকভাবে বন্ধ বা অফলাইনে রেখেছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, যদি কোনো কারণে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে যুদ্ধবিরতি ভেঙে গিয়ে আবারও সংঘাত শুরু হয়, তবে ইসরায়েলকে রক্ষা করার পুরো একক দায় একপ্রকার যুক্তরাষ্ট্রের ওপরই এসে পড়বে।

