ঠাকুরগাঁওয়ে লিগ্যাল এইড সেবা: দরিদ্র মানুষের জন্য ন্যায়বিচারের নতুন দিগন্ত

0
ঠাকুরগাঁওয়ে লিগ্যাল এইড সেবা: দরিদ্র মানুষের জন্য ন্যায়বিচারের নতুন দিগন্ত

অর্থের অভাবে ঠাকুরগাঁওয়ের অনেক মানুষ যখন আদালতের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাতে পারেন না, তখন তাদের পাশে নীরবে দাঁড়াচ্ছে লিগ্যাল এইড সেবা। একসময় যাদের কাছে বিচার পাওয়া ছিল দূর স্বপ্ন, আজ তাদের চোখে ফুটে উঠছে ন্যায়বিচারের নতুন আশা।

ঠাকুরগাঁও জেলা জজ আদালত প্রাঙ্গণে অবস্থিত লিগ্যাল এইড অফিসে প্রতিদিনই ভিড় করছেন নানা সমস্যায় জর্জরিত মানুষ। পারিবারিক কলহ, জমিজমা বিরোধ, প্রতারণা কিংবা দেনা-পাওনার জটিলতা- এসব সমস্যার সমাধান খুঁজতে এখানে আসছেন তারা। অর্থাভাবে মামলা পরিচালনা করতে না পারলেও লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা পেয়ে স্বস্তি পাচ্ছেন ভুক্তভোগীরা।

সরকারি এ সেবার আওতায় আইনজীবী নিয়োগ থেকে শুরু করে মামলা পরিচালনার সব ব্যয় বহন করা হয়। ফলে দরিদ্র ও অসহায় মানুষও নির্ভয়ে আইনের আশ্রয় নিতে পারছেন, যা বিচারপ্রাপ্তিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে।

লিগ্যাল এইড অফিস থেকে মূলত তিন ধরনের সেবা দেওয়া হয়- বিনামূল্যে আইনি পরামর্শ, মামলা পরিচালনার জন্য আইনজীবী নিয়োগ এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি। এর মধ্যে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এতে আদালতের বাইরে বসেই আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মীমাংসা করা হয়, যা সময় ও খরচ উভয়ই কমায় এবং পারস্পরিক সম্পর্কও অটুট রাখে।

কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এক বছরে ঠাকুরগাঁও লিগ্যাল এইড অফিসে মোট ৮১৪টি আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে ৭১৪টি নিষ্পত্তি হয়েছে। এ সময়ে উপকারভোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৪৩৬ জনে। মামলা দায়ের করা হয়েছে ২২৫টি এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে আপস করে ৪৪ লাখ ৪৯ হাজার টাকা আদায় করা হয়েছে। এছাড়া ৭০৩ জন বিনামূল্যে আইনি পরামর্শ নিয়েছেন। একই সময়ে আদালতে বিচারাধীন ১৯১টি মামলা আপসের মাধ্যমে প্রত্যাহার এবং ৮টি ক্ষেত্রে সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়েছে।

সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে জেলার পাঁচটি উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে লিগ্যাল এইড কমিটি গঠন করা হয়েছে। এসব কমিটিতে জনপ্রতিনিধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আইনি সচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সভা ও মতবিনিময় কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

উপকারভোগী আব্দুল করিম বলেন, আমি গরিব মানুষ। আগে কখনো ভাবিনি আইনের কাছে গিয়ে ন্যায়বিচার পাবো। লিগ্যাল এইড আমাকে সাহস দিয়েছে, আমার অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছে। এক নারী ভুক্তভোগী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানান, স্বামীর নির্যাতনের শিকার হয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন। পরে লিগ্যাল এইডের সহায়তায় তিনি আইনি প্রক্রিয়ায় এগোতে পেরেছেন। পীরগঞ্জের মালেক বলেন, জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে সহজেই মীমাংসা হয়েছে।

লিগ্যাল এইড অফিসার ও সিনিয়র সহকারী জজ মজনু মিয়া বলেন, দরিদ্র ও অসহায় মানুষকে বিনামূল্যে আইনি সহায়তার আওতায় আনাই তাদের মূল লক্ষ্য। তিনি জানান, জমিজমা বিরোধ, পারিবারিক সমস্যা এবং আপসযোগ্য ফৌজদারি মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য দুই পক্ষকে নিয়ে বসে সমাধান করা হয়, যা মানুষের জন্য কার্যকর ও উপকারী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here