শাস্তি বাড়ছে গুমের, মানবাধিকার কমিশনকে নখদন্ত দেওয়ার উদ্যোগ

0
শাস্তি বাড়ছে গুমের, মানবাধিকার কমিশনকে নখদন্ত দেওয়ার উদ্যোগ

নানা অসংগতি ও সীমাবদ্ধতা দূর করে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা “জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫” এবং “গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫” বাতিল করে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর আওতায় “জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬” ও “গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬”-এর খসড়া প্রস্তুত করেছে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

খসড়া দুটি নিয়ে মতামত নিতে আজ রবিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অংশীজন সভার আয়োজন করা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। 

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অ্যাটর্নী জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল, সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম, ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি স্টিফেন লিলার, গুমের শিকার সাবেক সংসদ সদস্য এম ইলিয়াস আলী-এর সহধর্মিণী ও সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদী, আইনজীবী, মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। স্বাগত বক্তব্য দেন লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের সচিব ড. হাফিজ আহমেদ চৌধুরী।

সভায় অংশীজনরা গুম তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের এসআই পর্যায়ে দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি তোলেন। তাদের ভাষ্য, কোনো বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে একজন এসআই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর সদস্যদের অপরাধ তদন্তে ওই বাহিনীকে সম্পৃক্ত করার বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। কেউ কেউ আইন দুটি নিয়ে গণশুনানির দাবি জানান। মানবাধিকার কমিশনের বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা কমিশনের হাতেই রাখার প্রস্তাবও আসে।

সভায় জানানো হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশে বেশ কিছু অসংগতি ছিল। নতুন খসড়ায় গুমকে সরাসরি ‘ক্রিমিনাল অফেন্স’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এর ফলে গুমের ঘটনা আর শুধু মানবাধিকার কমিশনের তদন্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে এর বিচার ও তদন্তের পথ স্পষ্ট করা হয়েছে।

নতুন খসড়ায় শাস্তির বিধানও কঠোর করা হয়েছে। আগের অধ্যাদেশে যাবজ্জীবনের পাশাপাশি “অনধিক ১০ বছর” কারাদণ্ডের বিধান থাকায় বিচারক চাইলে খুব কম সাজাও দিতে পারতেন। নতুন খসড়ায় ন্যূনতম ১০ বছরের সাজা নির্ধারণ করা হয়েছে। থানায় মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানালে সরাসরি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নালিশ মামলা করার সুযোগ রাখা হয়েছে। তদন্ত শেষ করতে হবে ৯০ দিনের মধ্যে এবং বিচার নির্দিষ্ট সময়ে শেষ না হলে সুপ্রিমকোর্টে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে হবে।

খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, রাজনৈতিক কারণ, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা অখণ্ডতার অজুহাতে কাউকে তুলে নিয়ে যাওয়া যাবে না।

গুমকে বাংলাদেশ থেকে চিরতরে বিদায় করার আহ্বান জানিয়ে তাহসিনা রুশদী বলেন, কার্যকর আইন প্রয়োজন, যা শুধু ভবিষ্যতের গুম নয়, অতীতে গুম হওয়া ব্যক্তিদের বিচারও নিশ্চিত করবে। তিনি বলেন, তার স্বামী এম ইলিয়াস আলী ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল গুম হন। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ভুক্তভোগী পরিবারগুলো এখনও দৃশ্যমান অগ্রগতির তথ্য পায়নি।

আইনমন্ত্রী বলেন, “আমরা আর একটি গুমও দেখতে চাই না। নখদন্তহীন মানবাধিকার কমিশনও চাই না।” তিনি বলেন, অতীতে মানবাধিকার কমিশন অনেক ঘটনায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। তাই নতুন আইনে প্রতিটি স্তরে সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং কমিশনের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনার সুযোগ রাখা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদনকে আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে কমিশন কার্যকর ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। বাজেট অধিবেশনের পর সংসদে আইন দুটি পাস হতে পারে বলেও জানান তিনি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here