ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্র যেন এক বিশাল ক্যানভাস, যেখানে এখন শুধু গেরুয়া রঙেরই আধিপত্য। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাবলির পর নরেন্দ্র মোদি এক অপরাজেয় শক্তিতে পরিণত হয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, মোদির এই ‘শক্তিশালী হাত’ এখন কেবল অর্থনৈতিক সংস্কারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা আঘাত হানবে ভারতের দীর্ঘদিনের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর মূলে। হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডাকে ত্বরান্বিত করতে মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের বিশেষ অধিকার কেড়ে নেওয়া এবং হিন্দি বলয়ের রাজ্যগুলোর গুরুত্ব বাড়িয়ে সংসদীয় সীমানা পুনর্নির্ধারণের মতো বিতর্কিত পদক্ষেপ নিতে চলেছে বিজেপি সরকার।
বিজেপির তুরুপের তাস এখন ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ বা অভিন্ন দেওয়ানি বিধি। বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, দত্তক এবং উত্তরাধিকারের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো এখন আর ধর্মীয় আইন দিয়ে চলবে না; বরং রাষ্ট্রের তৈরি এক ছাতার তলায় চলে আসবে সব ধর্ম। মোদি সরকারের এই লক্ষ্যকে হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শের এক চূড়ান্ত বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু এর নেপথ্যে কি লুকিয়ে আছে কোনো গভীর ক্ষত? সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং আদিবাসীরা এই পদক্ষেপকে দেখছেন তাদের ধর্মীয় অস্তিত্বের ওপর সরাসরি আক্রমণ হিসেবে। তাদের মতে, এটি কেবল আইন নয়, বরং ভারতকে একটি হিন্দু রাষ্ট্রে রূপান্তরের চূড়ান্ত নীল নকশা।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং বিভিন্ন রাজ্যে নিরঙ্কুশ আধিপত্য মোদীকে এক নতুন আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে। যদিও রাজ্যসভায় প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় সংবিধান সংশোধন বা ‘এক দেশ এক নির্বাচন’-এর মতো বড় লক্ষ্যগুলো এখনো আটকে আছে, তবুও বিজেপি দমে যাওয়ার পাত্র নয়। দুই-তৃতীয়াংশ রাজ্য সরকারের নিয়ন্ত্রণ হাতে থাকায় মোদি সরকার এখন আঞ্চলিক পর্যায় থেকেই হিন্দুত্ববাদী শাসনব্যবস্থাকে ‘স্বাভাবিক’ করে তোলার কৌশলী পথে হাঁটছে। বিরোধীরা একে দেখছেন গণতন্ত্রের মোড়কে একনায়কতন্ত্রের পদধ্বনি হিসেবে।
বিপরীতে, ভারতের বিরোধী শিবিরের চিত্রটি যেন এক ভগ্নস্তূপের মতো। সিপিআই(এম) নেতা হান্নান মোল্লার মতো অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদের কন্ঠেও ফুটে উঠেছে চরম হতাশা। তিনি স্পষ্টই জানিয়েছেন, আগামী অন্তত দশ বছর বিজেপিকে হঠানোর মতো কোনো শক্তি ভারতের রাজনীতিতে নেই। বিরোধীরা খণ্ড-বিখণ্ড, লক্ষ্যহীন এবং আদর্শিক লড়াইয়ে পিছিয়ে। উত্তরপ্রদেশ বা পাঞ্জাবের মতো আসন্ন নির্বাচনগুলোতেও তারা কতটুকু ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন ঝুলে আছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষায়, মাঠ এখন ফাঁকা, আর গোলপোস্টের সামনে দাঁড়িয়ে কেবল একাই দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন নরেন্দ্র মোদি।
সবশেষে উঠে আসছে এক তিক্ত বাস্তব। সমালোচকদের দাবি, ২০১৪ সাল থেকে যে জয়যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ ভারতকে এক সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়েছে। একদিকে হিন্দু জাতীয়তাবাদের জয়জয়কার, অন্যদিকে কোণঠাসা সংখ্যালঘু অধিকার। ভোটার তালিকা থেকে মুসলিমদের নাম বাদ যাওয়া কিংবা বিরোধী কণ্ঠকে রাষ্ট্রীয় যন্ত্র দিয়ে দমন করার অভিযোগগুলো আজ আর নিছক গুঞ্জন নয়। বিশ্বের বৃহত্তম তথাকথিত গণতন্ত্র কি তবে আজ হিন্দু জাতীয়তাবাদের এক ‘গবেষণাগার’?

