চলচ্চিত্র বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড বা অস্কার জয়ের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম জারি করেছে এর নিয়ন্ত্রক বডি ‘অ্যাকাডেমি অফ মোশন পিকচার্স আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেস’। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ক্রমাগত জয়জয়কারের মধ্যে অ্যাকাডেমি কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করে বলেছে, অস্কার জিততে হলে অভিনয় ও চিত্রনাট্য মানুষের মাধ্যম তৈরি হতে হবে।
বিবিসি লিখেছে, সৃজনশীলতার মূলে মানুষের ভূমিকা নিশ্চিত করতেই এ ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে অ্যাকাডেমি। সম্মানজনক এ পুরস্কারটির নিয়ন্ত্রক অ্যাকাডেমি শুক্রবার চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্রের যোগ্যতার বিষয়ে নতুন কিছু নিয়ম জারি করেছে। অ্যাকাডেমি বলেছে, চলচ্চিত্রের জন্য করা অভিনয় ও লেখা কেবল মানুষের মাধ্যমে সম্পন্ন হলে তবেই তা অস্কার জয়ের যোগ্য বলে বিবেচিত হবে। বর্তমান সময়ে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার যেভাবে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে তার পরিপ্রেক্ষিতেই অস্কারের জন্য কোন ধরনের কাজ গ্রহণযোগ্য হবে তা পুনর্নির্ধারণ করেছে অ্যাকাডেমি।
পুরস্কারে যোগ্যতার এ হালনাগাদ শর্তাবলীতে অ্যাকাডেমি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, অস্কারের জন্য মনোনীত হতে হলে অভিনয়টিকে অবশ্যই ‘প্রমাণযোগ্যভাবে মানুষের মাধ্যমে সম্পাদিত’ হতে হবে। একইভাবে, চিত্রনাট্য বা যে কোনো ধরনের লেখনিকে অবশ্যই ‘মানুষের মাধ্যমে লেখা’ হতে হবে। অস্কারের নিয়মনীতিতে এসব পরিবর্তনকে ‘মৌলিক ও তাৎপর্যপূর্ণ’ পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছে এ কর্তৃপক্ষ। আর, বিষয়টি আলাদাভাবে সুনির্দিষ্ট করার প্রয়োজনীয়তা অ্যাকাডেমির ইতিহাসে এবারই প্রথম দেখা গেল।
গেল কয়েক মাসে মানুষের সৃজনশীল কাজকে বদল করতে বা নতুন করে তৈরির ক্ষেত্রে এআই টুল ও প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের বেশ কিছু উদাহরণ লক্ষ্য করা গেছে। যেমন, ২০২৫ সালে প্রয়াত অভিনেতা ভ্যাল কিলমারকে আসন্ন এক সিনেমায় প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের জন্য এআই প্রযুক্তির সাহায্যে পুনরায় পর্দায় ফিরিয়ে আনার প্রস্তুতি চলছে।
আবার গত বছর লন্ডনের জনপ্রিয় অভিনেত্রী ও কৌতুক অভিনেতা এলাইন ভ্যান ডার ভেলডেন দাবি করেছিলেন, তিনি ‘জনপ্রিয় সুপারস্টার’ বানানোর উদ্দেশ্যে সম্পূর্ণ কৃত্রিম বা নকল এআই অভিনেতা তৈরি করেছেন। দুই বছর আগে যখন হলিউডের লেখকদের প্রতিনিধিত্বকারী ইউনিয়ন ধর্মঘটে নেমেছিল তখন সেই লড়াইয়ের প্রধান এবং মৌলিক বিষয় ছিল চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন স্টুডিওগুলোতে চিত্রনাট্য লেখার কাজে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার।
বর্তমানের সকল এআই টুলের মূল ভিত্তি ‘লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল’ বা এলএলএম। এসব মডেলকে কয়েক দশক ধরে মানুষের তৈরি করা অগণিত লেখা, ছবি ও ভিডিওর ওপর ভিত্তি করে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, যাতে সেগুলো মানুষের মতোই নতুন কিছু তৈরি বা আউটপুট দিতে পারে। এ কারণেই হলিউডের বড় স্টুডিও, অভিনেতা ও লেখকরা বেশ কিছু এআই কোম্পানির বিরুদ্ধে কপিরাইট বা মেধাস্বত্ব লঙ্ঘনের দায়ে মামলা করেছেন। তবে অ্যাকাডেমি সার্বিকভাবে চলচ্চিত্রে এআই ব্যবহারের ওপর কোনো ঢালাও নিষেধাজ্ঞা জারি করেনি।
তারা বলেছে, অভিনয় ও লেখালেখির ক্ষেত্র ছাড়া যদি কোনো চলচ্চিত্র নির্মাতা তার কাজের অন্যান্য অংশে এআই টুল ব্যবহার করেন তবে তেমন ‘টুল বা প্রযুক্তি ব্যবহার করা অস্কার মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাড়তি সুবিধাও দেবে না, আবার কোনো ক্ষতিও করবে না’ অর্থাৎ কারিগরি ক্ষেত্রে এর ব্যবহার মনোনয়নের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না।
তিনি জানান, পুরস্কারের জন্য কোনো চলচ্চিত্রকে মনোনীত করার সময় অ্যাকাডেমি এবং এর প্রতিটি শাখা সেই কাজের মান বিচার করবে, বিশেষ করে তারা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখবে, সংশ্লিষ্ট সৃজনশীল সৃষ্টির মূলে একজন মানুষের ভূমিকা বা কৃতিত্ব ঠিক কতখানি ছিল। উল্লিখিত জেনারেটিভ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এজিআই ব্যবহারের বিষয়ে কোনো ধরনের প্রশ্ন বা সংশয় দেখা দিলে সেই ব্যবহারের ধরন ও মানুষের সৃজনশীল অংশীদারিত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য চাওয়ার পূর্ণ অধিকার অ্যাকাডেমির আছে।
চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার অবশ্য অনেক বছরের পুরানো বিষয়, বিশেষ করে ১৯৯০ এর দশক থেকেই ‘কম্পিউটার-জেনারেটেড ইমেজারি’ বা সিজিআই ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে পার্থক্য হচ্ছে, সিজিআই কায়িক বা ‘ম্যানুয়াল’ প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত, অর্থাৎ বিষয়টি এমন কাজ, যা সিনেমার বিভিন্ন উপাদান তৈরির জন্য মানুষ নিজেই নিজ হাতে সম্পন্ন ও নিখুঁত করে তোলে। এর বিপরীতে, এআই টুলগুলো সাধারণত এমনভাবে তৈরি হয়েছে, যা সাধারণ কিছু নির্দেশ বা ‘প্রম্পট’ ব্যবহারের মাধ্যমেই পুরো কাজটি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে করতে পারে।

