ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ সংকট: শেষ ভরসা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র  কতটা যোগান দিতে পারবে?

0
ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ সংকট: শেষ ভরসা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র  কতটা যোগান দিতে পারবে?

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা লেগেছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় শেষ ভরসার জোগানদাতা হিসেবে সামনে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে রেকর্ড রপ্তানির এই ধারা দেশটির সক্ষমতার সীমা দ্রুত উন্মোচন করছে বলে সতর্ক করছেন বিশ্লেষকেরা।

গত নয় সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন তেলক্ষেত্র ও মজুতাগার থেকে ২৫ কোটির বেশি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বিদেশে পাঠানো হয়েছে। আলাস্কা ও মেক্সিকো উপসাগরীয় উপকূলে তেল বোঝাই করা ট্যাঙ্কারগুলো জাপান, থাইল্যান্ড এমনকি অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত যাচ্ছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও সৌদি আরবকে ছাড়িয়ে বিশ্বের শীর্ষ অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারকে পরিণত হয়েছে এবং হরমুজ সংকটে জর্জরিত বিশ্ববাজারে একটি গুরুত্বপূর্ণ লাইফলাইন তৈরি করেছে।

তবে এই সাফল্যের পেছনে বড় ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। টানা চার সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্রের তেল ও জ্বালানির মোট মজুত কমে এখন ঐতিহাসিক গড়ের নিচে নেমে গেছে। উৎপাদন বাড়াতেও ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। সিএসআইএস–এর জ্যেষ্ঠ গবেষক ক্লেটন সিগল সতর্ক করে বলেন, বিদেশে বড় মাত্রায় তেল চলে গেলে দেশের ভেতরে সরবরাহের ভারসাম্য আরও কড়াকড়ি হয়ে উঠবে।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি সত্ত্বেও বৈশ্বিক ঘাটতি কাটেনি। যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে গত সপ্তাহে ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলারের ওপরে উঠেছে, যা ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ। যদি মার্কিন রপ্তানি সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে যায়, তাহলে তেলের জন্য প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হবে।

সবচেয়ে বেশি তেল যাচ্ছে এশিয়ায়। জাপান, যারা আগে প্রায় ৯০ শতাংশ তেল মধ্যপ্রাচ্য থেকে নিত, এখন দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রমুখী হয়েছে। জুনে বোঝাই হয়ে আগস্টে পৌঁছাবে—এমন চালানের জন্য জাপানি রিফাইনাররা ইতোমধ্যে অন্তত ৮০ লাখ ব্যারেল তেল কিনেছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরেও মার্কিন তেলের চাহিদা শক্তিশালী রয়েছে।

নিজ দেশে এর প্রভাবও স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের গড় দাম যুদ্ধ শুরুর পর গ্যালনপ্রতি এক ডলারের বেশি বেড়ে এখন ৪.৪০ ডলারের ওপরে। ডিজেলের দাম প্রায় দুই ডলার বেড়েছে। সামনে গ্রীষ্মকালীন ভ্রমণ মৌসুমে চাহিদা আরও বাড়বে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির উচ্চমূল্য রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হচ্ছে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রপ্তানি বৃদ্ধিকে ‘ঐতিহাসিক সাফল্য’ হিসেবে তুলে ধরলেও বাজার বলছে, বাস্তব সীমাবদ্ধতা সামনে। অবকাঠামো ও জাহাজ সংকটের কারণে মেক্সিকো উপসাগর থেকে নিয়মিতভাবে দিনে প্রায় ৬ মিলিয়ন ব্যারেলের বেশি রপ্তানি করা কঠিন; স্বল্প মেয়াদে তা সর্বোচ্চ ৭ মিলিয়নের কাছাকাছি যেতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ সংকটে যুক্তরাষ্ট্র এখন বিশ্ব জ্বালানি ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু এই ‘এনার্জি ডমিন্যান্স’ কতদিন টেকসই থাকবে, তা নির্ভর করছে যুদ্ধের মেয়াদ, অভ্যন্তরীণ মজুত ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here