ইউনিসেফের সতর্কতা উপেক্ষা করে হামের টিকা ক্রয় পদ্ধতি বদল করে অন্তর্বর্তী সরকার

0
ইউনিসেফের সতর্কতা উপেক্ষা করে হামের টিকা ক্রয় পদ্ধতি বদল করে অন্তর্বর্তী সরকার

বাংলাদেশে সম্প্রতি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ও মারাত্মক ভাইরাসজনিত রোগ হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। টিকার সংকট ও টিকাদান কর্মসূচির ব্যাঘাতের কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ৩০ এপ্রিল সকাল ৮টা থেকে ১ মে সকাল ৮টা পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগে আক্রান্ত হয়েছে মৃত্যু হয়েছে অন্তত চারজনের।

আরও জানা গেছে, ১৫ মার্চ থেকে ১ মে সকাল ৮টা পর্যন্ত সন্দেহজনক হামে আক্রান্তের সংখ্যা ৩৮ হাজার ৩০১ জন। এই সময়ে সন্দেহজনক হাম রোগে মৃত্যু হয়েছে ২৩১ জন।

তবে আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব সায়েন্সের বৈজ্ঞানিক গবেষণাভিত্তিক ওয়েবসাইট সায়েন্সের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, চলতি বছরের মার্চের মাঝামাঝি থেকে রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ৩২ হাজারের বেশি মানুষ হাম ও হামের উপসর্গজনিত রোগে আক্রান্ত হয়েছে এবং ২৫০ জনের বেশি মৃত্যু হয়েছে, যাদের বেশির ভাগই শিশু।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, অল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে।

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের হাসপাতালগুলোতে বর্তমানে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে অসংখ্য শিশুকে চিকিৎসা দিতে নিয়ে যাওয়া হয়, যাদের অনেকে শ্বাসকষ্টে ভুগছিল। বেডসংকট থাকায় অনেক শিশুকে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

হাম একসময় প্রায় নির্মূল হয়ে গেছে, বিজ্ঞানীরা এমনটি মনে করলেও এটি আবার ফিরে আসছে। কানাডা ও বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ সম্প্রতি তাদের ‘হাম-মুক্ত’ মর্যাদা হারিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রেই এ বছর ১ হাজার ৭০০ জনের বেশি হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। ২০ বছর আগেও এই সংখ্যা ছিল প্রায় ১০০। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকাতেও হামের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে।

সায়েন্স জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়, টিকা নিতে অনীহা, করোনা মহামারির সময় টিকাদান কার্যক্রমে ব্যাঘাত ও যুদ্ধের কারণে হাম আবার ফিরে আসছে।

২০২৪ সালে বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর টিকা কেনার ক্ষেত্রে অচলাবস্থা তৈরি হয়। সেখান থেকেই হাম মহামারির ভয়াবহ বিপর্যয় শুরু হয় বলে উল্লেখ করেছে সায়েন্স জার্নাল।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই সময় দেশজুড়ে টিকার তীব্র সংকট তৈরি হয় এবং টিকাদানের হার কমে যায়।

অপুষ্টি ও দুর্বল স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার কারণে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মর্মান্তিক ঘটনা তুলে ধরেছে যে, জনস্বাস্থ্যের অগ্রগতি কত দ্রুত নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশে ৯ ও ১৫ মাস বয়সে শিশুদের হাম-রুবেলা টিকার দুটি ডোজ দেওয়া হয়। সারাদেশের ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যে প্রতি চার বছর পর পর দেশব্যাপী এ কর্মসূচি চালানো হয়।

ইউনিসেফ এই টিকা সরবরাহ করত, যার অর্থায়ন আসতো মূলত বিশ্বজুড়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে পরিচালিত টিকার জোট ‘গ্যাভি’ ও বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে। কিন্তু ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার টিকা সরবরাহ পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনে। 

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ বন্ধ করে দিয়ে ‘উন্মুক্ত দরপত্র’ পদ্ধতি চালু করে। ইউনিসেফ এই পরিবর্তনের তীব্র বিরোধিতা করে সতর্ক করে বলেছিল, এই পদ্ধতি টিকাদান ব্যবস্থা ব্যাহত করতে পারে এবং মহামারির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স সায়েন্স জার্নালকে বলেন, বিষয়টি খুবই হতাশাজনক ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে তিনি অনুরোধ করেছিলেন যেন এটি না করা হয়।

ওই দরপত্র প্রক্রিয়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে যাওয়ায় টিকার মজুদ ফুরিয়ে যায় এবং নিয়মিত টিকাদান বন্ধ হয়ে যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। হাম-রুবেলা টিকাদানের সম্পূরক কর্মসূচি ২০২৪ থেকে পিছিয়ে ২০২৫ সালে নেওয়া হয়। একটি সম্পূরক কর্মসূচি বাতিলও করা হয়।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়ে তা খুবই দ্রুত ৫৪ জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। এরপর অন্তত ২১ হাজারের বেশি মানুষকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। গত ২৩ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করে জানায়, মিয়ানমারে যুদ্ধের কারণে টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হয়েছে এবং ভারতে এই রোগ ছড়িয়ে পড়ার যথেষ্ট ঝুঁকি আছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, হামের এই প্রাদুর্ভাব বাংলাদেশে হাম নির্মূলে আগের অর্জিত সাফল্যকে নস্যাৎ করে দিচ্ছে। সরকারের একটি গবেষণা ইনস্টিটিউট আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এএসএম আলমগীর জানান, টিকার অভাবের পাশাপাশি ভিটামিন ‘এ’ বিতরণ কর্মসূচি ৩ দফা বাদ পড়ায় শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা আরও কমে গেছে।

আইইডিসিআরের উপদেষ্টা মোহাম্মদ মুশতাক হোসাইন বলেন, টিকাদান ঘাটতির বাইরেও বাংলাদেশের হাম সংকট গভীর কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক বে-নজির আহমেদ বলেন, বর্তমানে হাম যে গতিতে ছড়াচ্ছে, তাতে জরুরি কর্মসূচি দিয়েও এই প্রাদুর্ভাব ঠেকানো সম্ভব না-ও হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেছেন, বর্তমান সরকার গত এপ্রিলে পুনরায় ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনার পদ্ধতি চালু করেছে এবং ৫ এপ্রিল থেকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জরুরি টিকাদান শুরু হয়েছে।

হামের এই পরিস্থিতির জন্য ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকার ও ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার উভয়কেই দায়ী করেছে বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার।

এদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকা কেনায় ব্যর্থতা ও দুর্নীতির অভিযোগ এনে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বিপ্লব কুমার দাস দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দায়ের করেছেন।

অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক সায়েদুর রহমান দাবি করেছেন, পুরনো ক্রয় ব্যবস্থা জরুরি প্রয়োজনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল এবং এর সংশোধন প্রয়োজন ছিল।

সায়েন্স জার্নালকে পাঠানো ই-মেইলে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার চেয়েছিল এটিকে ভবিষ্যতে নিয়মিত, নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে, যেন স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন না ওঠে বা পক্ষপাতিত্বের ধারণা তৈরি না হয়।

আগের পদ্ধতিতে কী ভুল ছিল, প্রশ্নের উত্তর না দিলেও অধ্যাপক সায়েদুর শিশুদের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে বলেছেন, হামের মতো সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুদের মৃত্যু হৃদয়বিদারক। সূত্র: সায়েন্স

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here