ফিফার নতুন প্রস্তাবনা অনুযায়ী ঘরোয়া লিগগুলো প্রতি মৌসুমে বিদেশে একটির বেশি ম্যাচ আয়োজন করতে পারবে না। এই প্রস্তাবনাটি বিতর্কিত ‘আন্তর্জাতিক ম্যাচ’ অনুমোদনের মানদণ্ডকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।
প্রায় দুই বছর আগে গঠিত ফিফার একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ দ্বারা তৈরি একটি নতুন প্রোটোকল এই বিভাজনমূলক বিষয়টি তদারকির জন্য আরও স্পষ্ট নিয়মকানুন আনবে এবং কঠোর সীমা নির্ধারণ করবে।
এতে প্রতিটি লিগকে একটি শীর্ষ-বিভাগের ম্যাচ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার অনুমতি দেওয়ার পাশাপাশি আয়োজক দেশগুলোকে প্রতি মৌসুমে অন্য লিগের সঙ্গে সম্পর্কিত সর্বোচ্চ পাঁচটি ম্যাচ আয়োজন করার অনুমতি দেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
লা লিগা এবং সেরি আ এই মৌসুমে যথাক্রমে মিয়ামি এবং পার্থে লিগ ম্যাচ আয়োজনের পরিকল্পনা করেছিল। যা ফিফা এবং উয়েফাকে জড়িত করে একটি রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেয়। কিন্তু স্থানীয় কর্তৃপক্ষের আপত্তির পর ভিয়ারিয়াল বনাম বার্সেলোনা এবং মিলান বনাম কোমো ম্যাচ দুটি বাতিল করা হয়। লা লিগার আমেরিকান প্রোমোটার, রেলেভেন্ট স্পোর্টসও শেষ মুহূর্তে পিছিয়ে যায়। এই ঘটনাগুলোর সঙ্গে জড়িত অনেক পক্ষের মধ্যে তীব্র তিক্ততার সৃষ্টি করে।
নতুন প্রোটোকল অনুযায়ী, কোনো প্রতিযোগিতামূলক খেলা বিদেশি কোনো অঞ্চলে স্থানান্তরের অনুরোধ কেবল তখনই বিবেচনা করা হবে, যদি সকল প্রধান অংশীজনের অনুমোদন থাকে এবং ফিফার ভেটো দেওয়ার অধিকার থাকে। ফিফার কাছে পাঠানোর আগে যেকোনো অনুরোধকে সংশ্লিষ্ট ক্লাবগুলোর জাতীয় সমিতি, তাদের কনফেডারেশন এবং খেলাটি আয়োজন করতে ইচ্ছুক দেশের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ও তার কনফেডারেশনের দ্বারা অনুমোদিত হতে হবে।
এই মডেলের অধীনে ক্লাবগুলো যদি বিদেশে কোনো ম্যাচ আয়োজনের জন্য ঘরোয়া লীগের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যায়, তবে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করা হবে না। ইংল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএ) প্রিমিয়ার লীগের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো পরিবর্তন অনুমোদন করবে না, কিন্তু এই ধরনের সামঞ্জস্য সব দেশে নাও থাকতে পারে এবং এর ফলে উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারে।
দ্য গার্ডিয়ান এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাজের চাপ এবং অতিরিক্ত ভ্রমণের কারণে খেলোয়াড়দের স্বার্থে ফিফা অনুরোধগুলো আটকে দিতে পারে। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে, বিদেশে অনুষ্ঠিত ঘরোয়া ম্যাচ থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব খেলাধুলার জগতে পুনর্বণ্টনের নিশ্চয়তা এবং আয়োজক দেশের লীগ যাতে বিরূপভাবে প্রভাবিত না হয় তার প্রমাণ চাওয়া। ক্লাবগুলোর সমর্থকদের খেলা দেখতে আসার জন্য পরিকল্পনা এবং প্রয়োজনে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা রয়েছে, তার প্রমাণও চাওয়া হবে।
২০১৪ সালে প্রণীত বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, ফিফা তার নিয়মাবলীতে উল্লিখিত ‘আন্তর্জাতিক ম্যাচ’ কেবল তখনই আটকে দিতে পারে, যখন সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয় না। ওয়ার্কিং গ্রুপের পরবর্তী বৈঠকের জন্য কোনো তারিখ নির্ধারিত হয়নি, যেখানে অংশীজনদের মতামত বিবেচনা করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে আগামী মৌসুমের জন্য এই প্রোটোকলটি কার্যকর করার একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষা ফিফার রয়েছে।
নিয়মকানুন কঠোর করা হলেও, এই বিভেদ সৃষ্টিকারী বিষয়টি নিয়ে খেলাধুলার জগতে এবং সমর্থক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে তীব্র বিতর্ক হয়তো থামবে না। গত বছর লা লিগা এবং সেরি আ একটি লিগ ম্যাচ সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করার পর ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। তারা আবারও চেষ্টা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, কিন্তু প্রিমিয়ার লিগ কর্তৃপক্ষ জোর দিয়ে বলেছে, তারা এমনটা করবে না। যদিও এই ব্যাপক সন্দেহ রয়েছে, বিশেষ করে কিছু আমেরিকান মালিক যুক্তরাষ্ট্রে লিগ ম্যাচ আয়োজন করতে আগ্রহী।
উয়েফা তাদের অনিচ্ছার কথা উল্লেখ করেই ম্যাচগুলোর অনুমোদন দিয়েছিল এবং ফিফার কাঠামোকে ‘যথেষ্ট স্পষ্ট ও বিস্তারিত নয়’ বলে বর্ণনা করেছিল। ফিফা বিদেশে ম্যাচ নিষিদ্ধ করার বিষয়টি খতিয়ে দেখেছিল, কিন্তু আইনি পরামর্শে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।
ফিফার চিন্তাভাবনায় মেজর লীগ সকার এবং ইউএস সকারকে রক্ষা করার আকাঙ্ক্ষাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ক্লাবগুলোকে যদি লীগ ম্যাচগুলো বিদেশে সরিয়ে নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হতো, তবে আমেরিকান বাজারই তাদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠত।
একটি দেশ এক মৌসুমে পাঁচটির বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজন করতে পারবে না—এই বিধানটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এই উদ্বেগের কারণে, ইউরোপ, দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার ক্লাবগুলো লাভজনক উত্তর আমেরিকান টিকিটের বাজারের সুবিধা নিতে সেখানে খেলতে এসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ছেয়ে ফেলবে।
বিভিন্ন মহাদেশের ক্লাব বা জাতীয় দলের মধ্যে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা আয়োজনের জন্য প্রায় একই ধরনের একগুচ্ছ প্রোটোকলের খসড়াও তৈরি করা হয়েছে। ফিফার ক্লাব বিশ্বকাপের কোনো পরিকল্পিত পরিবর্তন—যেমন আরও সম্প্রসারণ বা আরও ঘন ঘন আয়োজন—এই পদ্ধতিগুলোর আওতায় আসবে কিনা, তা স্পষ্ট নয়।
শীর্ষ পর্যায়ের ম্যাচগুলোর প্রস্তাবনার মতোই, এই নিয়মগুলোর অধীনে ঘরোয়া লীগগুলোর সঙ্গে কোনো পরামর্শ করা হবে না। ফলে তাত্ত্বিকভাবে একটি নতুন টুর্নামেন্টের অনুমোদন দেওয়া হলে প্রিমিয়ার লীগকে বাদ দেওয়া হতে পারে।
ফিফা বেশ কিছুদিন ধরে আন্তর্জাতিক ম্যাচের বিষয়টি নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করছে এবং রেলেভেন্টের সঙ্গে বছরের পর বছর ধরে একটি আইনি লড়াই চালিয়েছে। ২০১৯ সালে রেলেভেন্ট ইউএস সকারের বিরুদ্ধে একটি অ্যান্টি-ট্রাস্ট মামলা দায়ের করে। কারণ তার আগের বছর মায়ামিতে বার্সেলোনার সঙ্গে জিরোনার খেলার জন্য লা লিগার একটি অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। ফিফাকে সহ-অভিযুক্ত হিসেবে নাম দেওয়া হয়েছিল।
রেলেভেন্ট ২০২৪ সালে মামলাটি প্রত্যাহার করে নেয়, যার ফলে নিউইয়র্কভিত্তিক এই সংস্থাটি ছয়টি কনফেডারেশন, ইউরোপীয় ফুটবল ক্লাব এবং ওয়ার্ল্ড লিগের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ফিফার ওয়ার্কিং গ্রুপে অন্তর্ভুক্ত হয়। এরপর থেকে কর্তৃপক্ষ এবং ক্লাবগুলোর সঙ্গে রেলেভেন্টের সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে।
গত বছর এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান রেলেভেন্ট ফুটবল পার্টনার্স ইউরোপের সবচেয়ে বড় ক্লাবগুলোর পক্ষে উয়েফার বাণিজ্যিক ও সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রির চুক্তি লাভ করে। যদিও ফিফার পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনই আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি। একটি সূত্র পরিস্থিতিটিকে চলমান বলে বর্ণনা করেছেন।

