টানা ৩৯ দিন ভয়াবহ যুদ্ধের পর গত ৮ এপ্রিল সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। এরপর ১১ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনায় অংশ নেয় উভয়পক্ষ। ওই আলোচনায় অংশ নিতে আসা ইরানি কূটনীতিক দলকে পাকিস্তানি বিমানবাহিনী নজিরবিহীন নিরাপত্তা পাহারা দিয়ে দেশে পৌঁছে দিয়েছিল। তিনটি সূত্র ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছে।
সেদিন ২১ ঘণ্টা ধরে আলোচনা হয়। এরপরও কোনও সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি ইরানি ও মার্কিন আলোচকরা। অবশেষে একটি সংক্ষিপ্ত সংবাদ সম্মেলন শেষে দ্রুত ইসলামাবাদ ছাড়ে মার্কিন কূটনীতিক দল।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যর্থ আলোচনার পর ইরানি কূটনীতিকদের আশঙ্কা ছিল, দেশে ফেরার পথে ইসরায়েল তাদের হত্যার চেষ্টা করতে পারে। এরপর পাকিস্তানের বিমানবাহিনীর একটি বড় বহর ইরানি কূটনীতিকদের বহন করা বিমানটিকে পাহারা দিয়ে দেশে পৌঁছে দেয় বলে ওই তিনটি সূত্র জানিয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে দুটি পাকিস্তানি সূত্র জানিয়েছে, ইসলামাবাদ থেকে দেশে ফিরে যাওয়া ইরানের প্রতিনিধিদলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাকিস্তান প্রায় দুই ডজন যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছিল। পাশাপাশি বিমানবাহিনীর এয়ারবোর্ন ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম ব্যবহার করে আকাশ পর্যবেক্ষণও করা হয়।
একটি সূত্র জানিয়েছে, ভবিষ্যতের আলোচনার ক্ষেত্রেও ইরানিরা চাইলে একই ধরনের নিরাপত্তা সুরক্ষা দেওয়া হবে, অথবা পাকিস্তানি বিমান তাদের পাকিস্তানের আকাশসীমায় গ্রহণ করবে।
আলোচনায় যুক্ত তৃতীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহান্তেই আরেক দফা আলোচনার সম্ভাবনা থাকায় পাকিস্তানে এরই মধ্যে আগাম কিছু ব্যবস্থা গ্রহণের কাজ শুরু হয়েছে।
একজন আঞ্চলিক কূটনীতিক বলেন, তেহরান থেকে তাকে বলা হয়- ইরানি প্রতিনিধিরা ‘সম্ভাব্য’ হুমকির কথা বলার পর পাকিস্তানই আকাশে নিরাপত্তা পাহারা দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছিল।
সম্ভাব্য এই হুমকি এবং ইরানি প্রতিনিধিদলকে পাকিস্তানের নিরাপত্তা পাহারা দেওয়ার বিষয়ে এর আগে আর কোথাও কোনও প্রতিবেদন প্রকাশ পায়নি।
রয়টার্স থেকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যোগাযোগ করে এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া মেলেনি।
জেনেভায় ইরানের স্থায়ী মিশন থেকেও মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া মেলেনি। পাকিস্তানের বিমানবাহিনী এবং সামরিক বাহিনীও এই অভিযানের বিষয়ে প্রশ্নের জবাব দেয়নি।
ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসও মন্তব্যের অনুরোধে কোনও প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
তবে একটি নিরাপত্তা সূত্র বলেছে, আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর, কিছু একটা গড়বড় হওয়া নিয়ে ইরানিরা সন্দিহান হয়ে উঠেছিল। তাদের সন্দেহ ছিল, তাদের লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।
ওই নিরাপত্তা সূত্র আরও বলে, “পাইলটের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এটি ছিল একটি বিশাল অভিযান। আপনি এমন একটি প্রতিনিধিদলের দায়িত্ব নিচ্ছেন, যারা আলোচনার জন্য এসেছে, আপনি তাদের আকাশপথে সুরক্ষা দিচ্ছেন, আপনার কাছে শক্তিশালী যুদ্ধবিমান রয়েছে, যা যেকোনও হুমকির মোকাবিলা করতে পারে।”
১৯৭৯ সালের ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর এবারের আলোচনা ছিল দুই দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগ। এ আলোচনায় যুক্ত সূত্রটি আকাশপথে নিরাপত্তা প্রদানের বিষয়টি নিশ্চিত করলেও এটা নিয়ে বিস্তারিত আরও কোনও তথ্য তিনি দেননি।
সূত্রটি শুধু বলেছে, “আমরা তাদের তেহরান পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছি। এখানে তাদের সফর শেষ হওয়ার পরও তাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব আমাদের ওপরই ছিল।”
একজন কর্মকর্তা বলেছেন, রবিবার ইরানি কূটনীতিকদের নিরাপদে দেশে পৌঁছে দেওয়ার অভিযানে পাকিস্তানের বিমানবাহিনীর বহরে চীনের তৈরি অত্যাধুনিক জে-১০ যুদ্ধবিমানও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
দুটি নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের নেতৃত্বে তাদের প্রতিনিধিদলটি নিরাপত্তা পাহারার অনুরোধ করেছিল, যা স্বাভাবিক প্রটোকলের চেয়ে অনেক বেশি। বাঘের গালিবাফ একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং প্রশিক্ষিত পাইলট।
ওই আঞ্চলিক কূটনীতিক আরও বলেন, ইরানিরা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও অনুরোধ করেনি। তবে তারা ‘এই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, ইসরায়েল এমনকি তাদের বহন করা বিমানেও হামলা করতে পারে।’
এ কারণে পাকিস্তান নিরাপত্তা পাহারা দেওয়ার ওপর জোর দেয়।
প্রতিনিধিদলটি তেহরানে অবতরণ করেনি। তারা কোথায় অবতরণ করেছে, সে তথ্য দিতেও অস্বীকৃতি জানান ওই কূটনীতিক।
আব্বাস আরাগচি ও মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের নাম ইসরায়েলের হামলার লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় ছিল। পরে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তক্ষেপের অনুরোধ করে তাদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার ব্যবস্থা করে।
পাকিস্তানের যুক্তি ছিল, তারা বেঁচে না থাকলে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে যুদ্ধ শুরু করেছিল, তা নিয়ে আলোচনার জন্য ইরানের পক্ষে আর কেউ অবশিষ্ট থাকবে না। সূত্র: রয়টার্স, ডন নিউজ

