‘৬০০-৭০০ জনের ধর্ষণ’, ব্রিটিশ সংসদে ভুক্তভোগী নারীর জবানবন্দি পাঠ করলেন এমপি

0
‘৬০০-৭০০ জনের ধর্ষণ’, ব্রিটিশ সংসদে ভুক্তভোগী নারীর জবানবন্দি পাঠ করলেন এমপি

যুক্তরাজ্যজুড়ে সংগঠিত ‘গ্রুমিং গ্যাং’ বা পরিকল্পিত শিশু যৌন শোষণ চক্রের ভয়াবহ ও শিউরে ওঠার মতো চিত্র আবারও প্রকাশ্যে এসেছে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে সম্প্রতি এক আবেগঘন ও চাঞ্চল্যকর বক্তব্য দেওয়ার সময় স্বতন্ত্র এমপি রুপার্ট লো বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী নারীর রোমহর্ষক জবানবন্দি পাঠ করে শোনান। তার এই বক্তব্য দেশটিতে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার বিতর্ককে নতুন করে উসকে দিয়েছে। 

যুক্তরাজ্য সরকারের পূর্ববর্তী বিভিন্ন তদন্তে উঠে এসেছে যে, এই সংগঠিত শিশু যৌন নিপীড়ন চক্রের সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের একটি বড় অংশই পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ট্যাক্সিচালক ও ব্যবসায়ী। রুপার্ট লো তাঁর নিজস্ব উদ্যোগে পরিচালিত একটি স্বাধীন অনুসন্ধানের ভিত্তিতে এই ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য সংগ্রহ করেন এবং দেশটির সংসদকে এই চরম নৃশংসতার বিরুদ্ধে অবশেষে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।

সংসদে পাঠ করা ভুক্তভোগী নারীদের জবানবন্দিতে চরম সহিংসতা, জোরপূর্বক গর্ভধারণ, এমনকি পৈশাচিক ও অমানবিক নির্যাতনের রোমকূপ খাড়া করা বিবরণ উঠে এসেছে। এক নারী জানিয়েছেন, মাত্র ১৩ বছর বয়স থেকে শুরু হওয়া নির্যাতনের তিন বছরে তিনি আনুমানিক ৬০০ থেকে ৭০০ জন ভিন্ন ভিন্ন পুরুষের দ্বারা গণধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন। ১৫ বছর বয়সী আরেক ভুক্তভোগী জানান, আশঙ্কাজনক রক্তপাত ও তীব্র শারীরিক ক্ষত নিয়ে হাসপাতালে গেলেও লোকলজ্জা ও প্রাণনাশের ভয়ে তিনি সত্য বলতে পারেননি, আর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও কোনো প্রশ্ন না করেই তাকে ওষুধ দিয়ে ছেড়ে দেয়। জবানবন্দিতে এমনকি কুকুরের খাঁচায় মেয়েদের বন্দি করে রাখা এবং পাশবিক নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে বাজি ধরার মতো বিকৃত মানসিকতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। 

এমপি রুপার্ট লো-র নেতৃত্বে গত বছর পরিচালিত বেসরকারি তদন্তে যুক্তরাজ্যের অন্তত ৮৫টি এলাকায় এই ধরনের সংঘবদ্ধ শিশু যৌন শোষণের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তার প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত পুরুষদের একটি বড় অংশ এই ‘ধর্ষণ গ্যাং’ পরিচালনা করছে, যা অনুমানের চেয়েও অনেক বেশি বিস্তৃত। একইসঙ্গে বর্ণবাদী তকমা পাওয়ার ভয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ বছরের পর বছর ধরে এসব জেনেও নীরব ভূমিকা পালন করেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যে এই গ্রুমিং গ্যাং কেলেঙ্কারি প্রথম এক দশকেরও বেশি সময় আগে ইয়র্কশায়ারের রদারহ্যাম শহরে আলোড়ন সৃষ্টি করে। সেখানে পরবর্তীতে জানা যায় যে, ১৯৯৭ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে প্রায় ১,৪০০ শিশু এই ভয়াবহ চক্রের শিকার হয়েছিল।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাকের আমলে ২০২৩ সালে গঠিত চাইল্ড সেক্সুয়াল এক্সপ্লয়টেশন টাস্কফোর্সের তথ্য অনুযায়ী, কেবল ২০২৩ সালেই যুক্তরাজ্যে শিশুদের বিরুদ্ধে ১ লাখ ১৫ হাজারের বেশি যৌন অপরাধের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে একটি বড় অংশই সংঘবদ্ধ অপরাধ। গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়রের অধীন ২০২৪ সালের একটি স্বাধীন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০০৪ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত রচডেল কাউন্সিলে ব্যাপক আকারে এই শোষণ চললেও তৎকালীন কর্মকর্তারা তা স্বীকার করতে ব্যর্থ হন। যদিও পরবর্তীতে বিভিন্ন অভিযানে বহু অপরাধীকে সাজা দেওয়া হয়েছে, যাদের বেশির ভাগই ব্রিটিশ-পাকিস্তানি। 

তবে ভুক্তভোগীদের এই নতুন জবানবন্দি প্রমাণ করে যে, ব্রিটিশ সমাজের গভীরে গেঁড়ে বসা এই অন্ধকার ক্ষত দূর করতে এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে বর্তমান প্রশাসনকে আরও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।

সূত্র: এনডিটিভি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here