২০ মাসে ধর্ষণ নির্যাতনে নিহত ৬৪৩ শিশু

0
২০ মাসে ধর্ষণ নির্যাতনে নিহত ৬৪৩ শিশু

দেশে ধর্ষণের পর শিশু হত্যার ঘটনা বাড়ছে। সারা দেশে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ২০ মাসে ৬৪৩ শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতনে নিহত হয়েছে। সেই হিসাবে প্রতি মাসে ৩২ জনের বেশি শিশু নিহত হয়।

চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ২০৩ জন শিশু নিহত হয়। এর মধ্যে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত সারা দেশে ৪৭৮ জন শিশু নিহত হয়। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রতিবেদনে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে অন্তত এক হাজার ৮৯০ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে এক হাজার ৪০৭ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়। ৪৮৩ জন শিশু নিহত হয়। এ ছাড়া এসব শিশুর মধ্যে ৫৮০ জন ধর্ষণ এবং ৩১৮ জন যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে।

সর্বশেষ গত মঙ্গলবার রাজধানীর পল্লবীতে ধর্ষণের পর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় শিশু শিক্ষার্থী রামিসা। ঘটনায় গ্রেপ্তার সোহেলের বাসা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। শিশুটির বাবা-মায়ের আক্ষেপ ও ক্ষোভ, আর আহাজারি এখন দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

এইচআরএসএসের প্রতিবেদন বলছে, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে দেশে ৫১৯ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৩২৪ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার। এতে চার মাসে দেশে ১৯৫ জন প্রাণ হারিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, অপরাধের সঠিক ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হওয়া, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, দরিদ্র ভুক্তভোগীদের মামলা চালানোর সামর্থ্যের অভাব এবং আইনের ফাঁকফোকরে অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতির কারণে এসব অপরাধ বাড়ছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ঘটনাগুলো কিছুদিনের জন্য আলোচনায় এলেও, আড়ালে থাকা অসংখ্য ঘটনা বছরের পর বছর ধরে হিমাগারে পড়ে থাকে। এমনকি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করা ঘটনাগুলোও সহজে বিচারের মুখ দেখে না। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মাগুরায় আলোচিত শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার এক বছর পেরিয়ে গেলেও ভুক্তভোগী পরিবার এখনো চূড়ান্ত বিচারের আলো দেখেনি।

এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে যা রয়েছে :

এইচআরএসএসের প্রতিবেদন বলছে, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশে অন্তত দুই হাজার ৬১৭ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ১০১৬ জন ধর্ষণের শিকার, যার মধ্যে ৫৫০ (৫৪ শতাংশ) জন ১৮ বছরের কম বয়সী বা শিশু। এ ছাড়া ২৩০ জন নারী ও কন্যাশিশু গণধর্ষণের শিকার এবং ধর্ষণের পর ৩৩ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় আত্মহত্যা করেছে ১১ নারী। ৫০৪ জন নারী ও কন্যাশিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে শিশু ২৭০ জন।

চলতি বছরের এপ্রিল মাসে কমপক্ষে ২৯৪ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে অন্তত ৬৮ জন, যাদের মধ্যে ৩০ (৪৪%)  জন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী। এটা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়, ১৩ জন নারী ও কন্যাশিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। অন্যদিকে ৭৯ জন নারী ও কন্যাশিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে, তন্মধ্যে শিশু ৪০ জন।

পাঁচ বছরে দুই সহস্রাধিক শিশু ধর্ষণ, বিচার পেতে দীর্ঘসূত্রতা

বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান দেশের শিশু সুরক্ষার এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে দেশে মোট দুই হাজার ৩৩৯টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। বছরভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সর্বশেষ ২০২৬ সালে ৯৪টি, এর আগে ২০২৫ সালে ৪৫৬টি, ২০২৪ সালে ২৩৪টি, ২০২৩ সালে ৩১৪টি, ২০২২ সালে ৫৬১টি এবং ২০২১ সালে ৭৭৪টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিগত পাঁচটি পূর্ণাঙ্গ বছরের হিসাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৪৪৯টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

একইভাবে বিগত বছরগুলোতে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে শিশু ধর্ষণচেষ্টার ঘটনাও।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সর্বশেষ ২০২৬ সালে ৩৪টি, ২০২৫ সালে ১৬৭টি, ২০২৪ সালে ৬৬টি, ২০২৩ সালে ৮৫টি, ২০২২ সালে ১০১টি এবং ২০২১ সালে ১৮৫টি ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। বিগত পাঁচটি পূর্ণাঙ্গ বছরের (২০২১-২০২৫) হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১২১ শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়েছে। বিচারহীনতা ও দীর্ঘসূত্রতার এই ভয়াবহ আবহে বার্ষিক এই গড় হার দেশের শিশু সুরক্ষার চরম বিপর্যয়কে নির্দেশ করে।

আদালতের জিআর শাখা সূত্রে এ তথ্য জানা যায়, ঢাকার বিভিন্ন আদালতের তথ্যানুযায়ী শিশু ধর্ষণসংক্রান্ত মামলা আছে প্রায় তিন হাজার। এ বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ঢাকার ৫০টি থানায় সব ধরনের ধর্ষণ ও ধষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা হয়েছে অন্তত ২১৪টি।

মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবীরা যা বলছেন :

মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীদের মতে, বিচারহীনতার এই সংস্কৃতির কারণেই শিশু ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ওসিসি) আইনজীবী ফাহমিদা আক্তার মামলার জট ও দীর্ঘসূত্রতার পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করে বলেন,​ ‘আইনে উল্লিখিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ না হওয়া অন্যতম প্রধান কারণ। তদন্ত কর্মকর্তারা সঠিক সময়ে মেডিক্যাল রিপোর্ট পান না, তার ওপর তাঁরা ধর্ষণের মতো স্পর্শকাতর মামলার পাশাপাশি অন্যান্য সাধারণ ডিউটিও পালন করেন। এ ছাড়া অনেক ট্রাইব্যুনালে নারী ও শিশুর পাশাপাশি মানবপাচার বা শিশু আইনের অন্যান্য মামলারও বিচার করতে হয়। সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয় সঠিক সময়ে সাক্ষীদের আদালতে হাজির করতে না পারায়।’

তিনি আরো আশাবাদ ব্যক্ত করেন, মাগুরার আছিয়া হত্যাকাণ্ডের মতো পল্লবীর শিশু নির্যাতনের ঘটনাটিরও যেন বিচারিক আদালত ও হাইকোর্ট উভয় জায়গাতেই দ্রুততম সময়ে নিষ্পত্তি করে রাষ্ট্র দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করে।

বিচার প্রদানের আইনি সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, ‘ন্যায়বিচার নিশ্চিতে আইন অনুযায়ী কিছু নির্দিষ্ট প্রসিডিউরের মধ্য দিয়ে যেতেই হয়। মামলাগুলোতে মূলত দুটি জায়গায় সময়ক্ষেপণ হয়। প্রথমত, তদন্তে বিলম্বের কারণে পুলিশ রিপোর্ট সময়মতো জমা না পড়া। দ্বিতীয়ত, সাক্ষীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা। অনেক সময় সাক্ষীদের হাজির করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে, আবার হাজির করার পর জেরা ও অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়া থাকে।’

এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, উদ্বেগের বিষয় এই, একের পর এক শিশু ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা প্রমাণ করে—শিশু সুরক্ষায় বিদ্যমান ব্যবস্থা যথেষ্ট কার্যকর নয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, রাজধানীর মিরপুরে চাঞ্চল্যকর রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার প্রধান আসামি সোহেল ও তাঁর সহযোগী স্ত্রীকে ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মূল আসামি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছে। সম্ভাব্য সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে এ মামলার সুষ্ঠু তদন্ত সম্পন্ন করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে।

সৌজন্যে: কালের কণ্ঠ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here