স্থিতিশীলতার পথে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক

0
স্থিতিশীলতার পথে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক

দেশের ব্যাংকিং খাতে সাম্প্রতিক অস্থিরতার সময় আলোচনায় উঠে আসে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের নামও। নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও ব্যাংকটি আমানত, বিনিয়োগ ও গ্রাহক আস্থা ধরে রেখে স্থিতিশীলতার পথে এগিয়ে যাচ্ছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুতে দেশের ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং গ্রাহকের আমানত সুরক্ষার লক্ষ্যে ১২টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব ব্যাংকের মধ্যে ছিল আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকও।

পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে ব্যাংকটির কিছু অনিয়ম ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা সামনে আসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ৬ শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে ২০২৫ সালজুড়ে ব্যাংকটিতে অস্থিরতা তৈরি হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য সংস্থার অডিটে বড় ধরনের অর্থ আত্মসাৎ বা সংঘবদ্ধ লুটপাটের প্রমাণ মেলেনি। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ কারণেই ব্যাংকটি তুলনামূলক দ্রুত স্থিতিশীলতায় ফিরতে পেরেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, সংকটকালেও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক কখনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তা নেয়নি। অন্যদিকে কিছু দুর্বল ব্যাংকে গ্রাহকের ছোট অঙ্কের চেকও ডিজঅনার হওয়ার ঘটনা ঘটলেও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে এমন কোনো অভিযোগ ওঠেনি।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, ব্যাংকটির কোনো গ্রাহক চাহিদামতো অর্থ তুলতে ব্যর্থ হননি এবং নিয়মিত ব্যাংকিং সেবা অব্যাহত ছিল। ফলে সরাসরি গ্রাহক পর্যায়ে আস্থার বড় সংকট তৈরি হয়নি।

ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে আমানতের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫৪ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা, যা আগের বছরের ডিসেম্বরের তুলনায় প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা বেশি। একই সময়ে আমানত হিসাবের সংখ্যাও বেড়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে যেখানে হিসাব সংখ্যা ছিল ৩৬ লাখ ৩৭ হাজার ২৪০টি, সেখানে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৮ লাখ ৬৬ হাজার ৪৪৭টিতে।

২০২৬ সালের এপ্রিল শেষে হিসাব সংখ্যা আরও বেড়ে ৪০ লাখ ৪৫ হাজারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ চার মাসের ব্যবধানে হিসাব সংখ্যা বেড়েছে ১ লাখ ৭৮ হাজার ৫৫৩টি।
এছাড়া ২০২৫ সালের শেষে ব্যাংকের বিনিয়োগ দাঁড়ায় ৫০ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় বেশি।

গত দেড় বছরে ব্যাংকটি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম চালায়। আধুনিক কোর ব্যাংকিং সিস্টেম ‘আবাবিল এনজি’ চালুর মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেন আরও নিরাপদ, দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন হয়েছে বলে জানানো হয়।

বর্তমানে ইন্টারনেট ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, এটিএম, বিএফটিএন, আরটিজিএস ও এনপিএসবি সেবার কার্যকারিতা ও নির্ভরযোগ্যতা বেড়েছে। একই সঙ্গে দেশের ৩০৬টি উপজেলায় ৭৩৮টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ব্যাংকটি। ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মোট এজেন্ট ব্যাংকিং গ্রাহকের প্রায় ৪৯ শতাংশ নারী এবং ৮৮ শতাংশ আউটলেট গ্রামীণ এলাকায় অবস্থিত।

ব্যাংকটির আল-আরাফাহ রুরাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (এআরডিপি) বর্তমানে ২ হাজার ৭৮০টি গ্রামে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এ কর্মসূচির সদস্য সংখ্যা ৮৬ হাজারের বেশি, যার ৭২ শতাংশ নারী।

গত ১৬ মাসে এ কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৩০ হাজার নতুন হিসাব যুক্ত হয়েছে। বর্তমানে মোট হিসাব সংখ্যা ৪ লাখ ১০ হাজার ৯০০টি।

ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রাফাত উল্লাহ খান বলেন, ‘আস্থা হারানো সহজ, কিন্তু ফিরে পাওয়া কঠিন। নানা চ্যালেঞ্জ, অস্থিরতা ও গুজবের মধ্যেও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক গ্রাহকের আস্থা ধরে রাখতে পেরেছে।’

তিনি বলেন, ‘সংকটের সময়েও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তারল্য সহায়তা নিতে হয়নি, কোনো গ্রাহকের চেক ডিজঅনার হয়নি এবং আমানত, বিনিয়োগ ও গ্রাহক সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।’

তার ভাষায়, ‘সুশাসন, জবাবদিহি ও প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ব্যবস্থাপনা একটি প্রতিষ্ঠানকে আবারও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারে।’

সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের ব্যাংকিং খাতে যখন একের পর এক আর্থিক অনিয়ম ও আমানত সংকটের খবর সামনে এসেছে, তখন আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকে বড় ধরনের লুটপাটের প্রমাণ না পাওয়া এবং সংকটের মধ্যেও স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম অব্যাহত থাকা ব্যাংকটির জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here