সোনারগাঁয়ে জমে উঠেছে সিদ্ধেশ্বরী বটতলার বউমেলা

0
সোনারগাঁয়ে জমে উঠেছে সিদ্ধেশ্বরী বটতলার বউমেলা

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে আবারও শুরু হয়েছে পাঁচশ বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী বউমেলা। পহেলা বৈশাখে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর তিন দিনব্যাপী এ মেলার দ্বিতীয় দিনেই থাকে মূল আয়োজন। যেখানে ভিড় করেন দূর-দূরান্ত থেকে আগত সনাতন ধর্মাবলম্বী নারী-পুরুষ।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সোনারগাঁ উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন জয়রামপুর এলাকার ঐতিহ্যবাহী বটতলার এই মেলা শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি গ্রামীণ সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও সামাজিক বন্ধনের এক অনন্য মিলন মেলায় পরিণত হয়েছে। মূলত বটগাছকে ঘিরেই যুগ যুগ ধরে চলে আসছে এ আয়োজন, যা স্থানীয়দের কাছে ‘সিদ্ধেশ্বরী বটতলার বউমেলা’ নামে পরিচিত।

সকালের প্রথম প্রহর থেকেই বটতলার আশপাশ এলাকায় দেখা যায় ভক্তদের ঢল। নববধূ থেকে শুরু করে বয়োজ্যেষ্ঠ নারী সবাই ফল-ফলাদি, মিষ্টান্ন ও পূজার সামগ্রী নিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে বটবৃক্ষের নিচে পূজা-অর্চনায় ব্যস্ত থাকেন। রঙিন শাড়ি, ফুলেল সাজ আর ধর্মীয় আবহে পুরো এলাকা পরিণত হয় এক বর্ণিল উৎসবে। কুমারী মেয়েরাও অংশ নেয় এ আয়োজনে।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, এই বটগাছটি ‘সিদ্ধেশ্বরী দেবী’ হিসেবে পূজিত হয়ে আসছে বহু বছর ধরে। প্রতিবছর নববর্ষে এই বটতলায় পূজা দিলে সংসারে সুখ-শান্তি আসে, স্বামী-সন্তানের মঙ্গল হয়। এমন বিশ্বাস থেকেই নারীরা সারা বছর অপেক্ষায় থাকেন এই দিনের জন্য। অনেকেই মানত পূরণের অংশ হিসেবে কবুতর ওড়ানো এবং পাঁঠা বলিও দিয়ে থাকেন।

মেলার অন্যতম আকর্ষণ হলো গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী পণ্যের সমাহার। মৃৎশিল্পীদের তৈরি টেপা পুতুল, হাতি-ঘোড়া, পাখি, হাঁড়ি-পাতিলসহ নানা ধরনের সামগ্রী ক্রেতাদের দৃষ্টি কাড়ে। পাশাপাশি বাঁশ, কাঠ ও লৌহশিল্পের তৈরি নানান ব্যবহার্য জিনিসপত্র এবং বাহারি মিষ্টান্ন ও মন্ডা-মিঠাইয়ের দোকান মেলাকে করে তুলেছে আরও আকর্ষণীয়। শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সি মানুষের জন্যই এখানে রয়েছে আনন্দের খোরাক।

মেলায় আগত নারীরা জানান, পারিবারিকভাবে বড়দের কাছ থেকে এই মেলার গুরুত্ব সম্পর্কে শুনে আসছেন তারা। প্রতিবছরই তারা এখানে এসে পূজা দেন এবং সংসারের কল্যাণ কামনা করেন। তাদের বিশ্বাস, এই পূজা তাদের জীবনে শান্তি ও সমৃদ্ধি বয়ে আনে।

পুরোহিত উৎপল ভট্টাচার্য বলেন, বহু বছর ধরে এ মেলা ধর্মীয় ও সামাজিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। দুপুরে আনুষ্ঠানিক পূজা-অর্চনার মধ্য দিয়ে মূল কার্যক্রম শুরু হয় এবং দিনভর চলে ভক্তদের আগমন।

আয়োজক কমিটির কর্মকর্তা নিলোৎপল রায় জানান, প্রতিবছর নববর্ষ উপলক্ষে সিদ্ধেশ্বরী কালীপূজার আয়োজন করা হয় এবং এটি সম্পূর্ণ সার্বজনীনভাবে উদযাপিত হয়। এখানে শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ই নয়, ভিন্ন ধর্মের মানুষও অংশ নেয়, যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসিফ আল জিনাত বলেন, মেলাকে ঘিরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা গ্রহণ করা হয়েছে। নারী-কেন্দ্রিক এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজনকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here