সাইবার অপরাধে নতুন আতঙ্ক, তথ্য চুরি ছাড়িয়ে শারীরিক হুমকি

0
সাইবার অপরাধে নতুন আতঙ্ক, তথ্য চুরি ছাড়িয়ে শারীরিক হুমকি

সাইবার অপরাধীরা এখন কেবল ডিজিটাল তথ্য চুরিতেই আটকে নেই, মুক্তিপণ আদায়ে তারা ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারকে সরাসরি শারীরিক ক্ষতির হুমকিও দিচ্ছে।

বিবিসি লিখেছে, বিশ্বজুড়ে ‘ভায়োলেন্স-অ্যাজ-এ-সার্ভিস’ বা ভাড়ায় সহিংসতা চালানোর এ প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, যা সাইবার নিরাপত্তা জগতে এক নতুন ও ভয়াবহ আতঙ্ক তৈরি করেছে। কয়েক বছর আগে টিম বিসলি একদিন তার সদর দরজা খুলে দেখতে পেলেন দরজার গোড়ায় ছোট একটি প্যাকেট পড়ে আছে। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলছিলেন, “আমি ভেবেছিলাম, ‘আরে, এটা আবার কী?’ বক্সটি খুলে সঙ্গে সঙ্গেই আমি চিৎকার করে উঠলাম, ‘ওহ!’ তারপর দ্রুত তা হাত থেকে ফেলে দিলাম।”

বক্সের ভেতরে ছিল এক হুমকিমূলক চিরকুট। সেখানে তাকে সরে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল এবং কথা না শুনলে শারীরিক ক্ষতি করার ইঙ্গিতও ছিল। বিসলি এখন ‘সেম্পারিস’ নামের এক মার্কিন নিরাপত্তা কোম্পানিতে কাজ করেন। ওই সময় তিনি এক মার্কিন সরকারি সংস্থার হয়ে সাইবার হামলার মুক্তিপণ নিয়ে মধ্যস্থতা করছিলেন। তার বাড়িতে পৌঁছানো সেই পার্সেলটি আসলে ছিল সেই র‍্যানসমওয়্যার চক্রের পক্ষ থেকে সরাসরি এক হুমকি, যাদের সঙ্গে তাকে আলোচনা করতে হচ্ছিল।

বিশ্বজুড়ে সাইবার হামলার ঘটনা এখন আকাশচুম্বী। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের নতুন পরিসংখ্যান অনুসারে, কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই এ ধরনের হামলার সংখ্যা ২০১৫ সালে ছিল ২ লাখ ৮৮ হাজার ১২টি, যা গত বছর বেড়ে রেকর্ড পরিমাণ ১০ লাখ ৮ হাজার ৫৯৭ এ দাঁড়িয়েছে। এফবিআইয়ের তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালে আমেরিকার বিভিন্ন কোম্পানি ও সংস্থায় এসব হামলার ফলে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮০ কোটি ডলারে, যা ২০২৪ সালের ১ হাজার ৬৬০ কোটি ডলারের তুলনায় অনেক বেশি।

এদিকে, গত বছর যুক্তরাজ্যেও সাইবার হামলার ঘটনা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। সাধারণত এসব ক্ষেত্রে হ্যাকাররা কোনো কোম্পানির কম্পিউটার সিস্টেমে ঢুকে সংবেদনশীল তথ্য চুরি করে বা পুরো সিস্টেমের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কাজকর্ম অচল করে দেয়। এরপর সাইবার অপরাধীরা সেই তথ্য ফেরত দিতে বা সিস্টেমের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দিতে মুক্তিপণ বা মোটা অংকের অর্থ দাবি করে।

তবে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, বর্তমানে অনেক সংখ্যক সাইবার হামলাকারী তাদের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের জন্য আরও ভয়ংকর পথ বেছে নিচ্ছে, তারা সরাসরি শারীরিক ক্ষতির হুমকি দিচ্ছে। এফবিআইয়ের বার্ষিক তথ্যমতে, গেল বছর আমেরিকায় এ ধরনের শারীরিক হুমকির ঘটনা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।

সেম্পারিস-এর আলাদা এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে হওয়া র‍্যানসমওয়্যার হামলাগুলোর প্রায় ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে অপরাধীরা মুক্তিপণ দিতে অস্বীকার করলে কর্মীদের শারীরিক ক্ষতির হুমকি দিয়েছে। আমেরিকায় এ পরিস্থিতি আরও খারাপ। সেখানকার বিভিন্ন কোম্পানি প্রায় ৪৬ শতাংশ ক্ষেত্রে এ ধরনের শারীরিক হুমকির মুখে পড়েছে। এ প্রসঙ্গে বিসলি বলেছেন, “এই প্রবণতা আগে থেকেই আড়ালে ছিল। তবে এখন তা রূঢ় এক বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে এবং ধীরে ধীরে এর প্রকোপ বেড়েই চলেছে।”

হ্যাকাররা তাদের হাতে থাকা ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে কর্মীদের সরাসরি হুমকি দিচ্ছে, যার মধ্যে তাদের বাড়ির ঠিকানাও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কোম্পারি ‘টেনিয়াম’-এর জ্যাক ওয়ারেন এক হাসপাতালের মুক্তিপণ আলোচনার সময় এমনই এক পরিস্থিতির মুখে পড়েছিলেন।

ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের এ প্রধান নিরাপত্তা উপদেষ্টা বলেছেন, “আমরা খবর পাচ্ছিলাম, হাসপাতালের কর্মীরা সব ফোন কল পাচ্ছেন। হ্যাকাররা সরাসরি হাসপাতালে ফোন করে নার্সদের নাম ধরে ডাকছিল ও তাদের বলছিল, তারা জানে তারা (নার্সরা) কোথায় থাকেন। তারা কর্মীদের বাড়ির ঠিকানা থেকে শুরু করে সোশাল সিকিউরিটি নাম্বার পর্যন্ত বলে দিচ্ছিল, যাতে মানুষজন টের পায় যে তাদের ওপর নজর রাখা হচ্ছে। হ্যাকারদের কাছে এসব ব্যক্তিগত তথ্য থাকায় চিকিৎসকদের মধ্যে এক চরম ভীতি ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল।”

কখনও কখনও শারীরিক ক্ষতির এসব হুমকি সরাসরি না হয়ে পরোক্ষভাবেও আসে। তবে সেগুলোও কম প্রাণঘাতী নয়। যেমন, কিছু ক্ষেত্রে আক্রমণকারীরা কারখানার যন্ত্রপাতির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। তারা রোবট বা কনভেয়ার বেল্টের মতো বিভিন্ন যন্ত্র ইচ্ছামতো চালু বা বন্ধ করে নিজেদের ক্ষমতা জাহির করে, যা যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা বা মৃত্যুর কারণও হতে পারে।

অনেক র‍্যানসমওয়্যার চক্র রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট হলেও অধিকাংশ শারীরিক হুমকির ঘটনা আর্থিক মুনাফালোভী অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকেই আসে। এ ধরনের হ্যাকাররা সাধারণত তরুণ। এফবিআইয়ের নথি অনুসারে, এ ধরনের একটি চক্রের সদস্যদের বয়স ১৭ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। অনেক ক্ষেত্রে এসব সাইবার অপরাধীরা নিজেরা সরাসরি সহিংসতা না করে অন্যকে অর্থ দিয়ে ভাড়া করে বা হুমকি দেওয়ার কাজে লাগায়।

এ প্রসঙ্গে বিসলি বলেছেন, “অধিকাংশ ক্ষেত্রে হ্যাকাররা নিজের হাত নোংরা করতে চায় না।” ফলে তারা বিভিন্ন মেসেজ বোর্ড বা সামাজিক মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে লোক নিয়োগ করে এবং অর্থের বিনিময়ে কাউকে মারধর করা বা অনুসরণ করার মতো কাজগুলো করিয়ে নেয়।

সহিংসতার সবচেয়ে ভয়াবহ হুমকি ও প্রকৃত শারীরিক হামলার বিভিন্ন ঘটনা ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিয়োগের অন্ধকার জগতে বেশি দেখা যায়। যেমন, গত বছরের মে মাসে ফরাসি পুলিশ এক ক্রিপ্টোকারেন্সি মিলিয়নেয়ারের বাবাকে উদ্ধার করেছে, যাকে অপহরণ করে প্যারিসের শহরতলীতে মুক্তিপণের জন্য আটকে রাখা হয়েছিল।

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, অপহরণকারীরা ভুক্তভোগীর একটি আঙুল কেটে ফেলেছিল। গত বছর যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপে এ ধরনের ১৮টিরও বেশি ঘটনা ঘটেছে। শারীরিক হামলার সঙ্গে জড়িত সাইবার অপরাধের সংখ্যায় এক ‘নাটকীয় বৃদ্ধি’ দেখা গেছে। বর্তমানে এই ধরনের অপরাধ নিয়ে তদন্ত করছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ‘ইউরোপোল’। তারা ‘ভায়োলেন্স-অ্যাজ-এ-সার্ভিস’ বা ভাড়ায় সহিংসতা বন্ধ করার প্রচেষ্টায় কাজ করছে, যেখানে নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে অপরাধীরা অন্যের ওপর হামলা চালায়।

যুক্তরাষ্ট্রে গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে এফবিআই এক সতর্কবার্তা জারি করেছিল, যেখানে অনলাইনে সক্রিয় ‘ইন রিয়াল লাইফ কম’ নামের এক নেটওয়ার্ক থেকে আসা সহিংসতার ঝুঁকি নিয়ে হুঁশিয়ার করা হয়েছে।

এতে বলা হয়, এ অপরাধীরা ক্রমেই আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে এবং তারা সানন্দে অর্থের বিনিময়ে সহিংসতা বা হামলার প্রস্তাব দিচ্ছে। সাইবার সিকিউরিটি সফটওয়্যার কোম্পানি ‘ক্রাউডস্ট্রাইক’-এর কর্মকর্তা অ্যাডাম মেয়ার্স বলেছেন, “আপনি যদি কারও কোনো ক্ষতি করতে চান তবে আপনি এ অনলাইন নেটওয়ার্কের ভেতরেই এমন কাউকে পেয়ে যাবেন যে আপনার হয়ে সেই কাজটি করতে প্রস্তুত। যার মানে, কারও জানালার কাঁচ লক্ষ্য করে ইট মারা, কোনো কিছুতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া, গুলি চালানো বা অপহরণের মতো ঘটনাও। কারিগরিভাবে খুব বেশি দক্ষ নয় এমন ব্যক্তিরা সম্ভবত এ ‘ভায়োলেন্স-অ্যাজ-এ-সার্ভিস’-এর দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে। কারণ এ অপরাধ জগতে সহিংসতাই একমাত্র পথ, যা তাদের আয়ত্তে থাকে।

ক্রিপ্টোকারেন্সির ঘটনাগুলোতে ভুক্তভোগীরা সম্ভবত সামাজিক মাধ্যমে নিজেদের সাফল্য নিয়ে অতিরিক্ত আস্ফালন বা অসতর্ক কথাবার্তা বলে হ্যাকারদের নজরে চলে আসেন। মেয়ার্স বলেছেন, “যাদের কাছে স্বর্ণ আছে তারা যেভাবে কথা বলেন ক্রিপ্টোকারেন্সি থাকা ব্যক্তিদের আলাপচারিতা তার চেয়ে ভিন্ন হয়। তারা অনলাইনে সারাক্ষণ ক্রিপ্টো ট্রেডিং ও কত অর্থ আয় করলেন তা নিয়ে কথা বলেন, যেখানে উদ্দেশ্য থাকে ফলোয়ার বাড়ানো ও সবার নজরে আসা। আর যখনই আপনি এমনটি করছেন তখনই বিপদ ডেকে আনছেন।”

বিসলি বলেছেন, সাইবার অপরাধের সঙ্গে জড়িত শারীরিক সহিংসতার হুমকি সম্ভবত বাড়তেই থাকবে। কারণ ‘মানুষ এখনও এর ভয়ে অর্থ দিয়ে যাচ্ছে’। কেউই চায় না যে তাদের সন্তান অপহরণের শিকার হোক। এমন পরিস্থিতি আপনাকে সবসময় নিজের পিঠ বাঁচিয়ে চলতে ও পেছনে ফিরে তাকাতে বাধ্য করবে।

তথ্য সূত্র- বিবিসি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here