বিশ্ব টেনিসের এক নম্বর খেলোয়াড় আরিনা সাবালেঙ্কা কোর্টে যেমন আগ্রাসী, কোর্টের বাইরে ঠিক ততটাই শান্ত ও প্রাণবন্ত, এমনটাই দাবি করেছেন তিনি নিজেই। উইম্বলডনের আগে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বেলারুশের এই তারকা বলেছেন, তার মুখের অভিব্যক্তি ও কোর্টের আচরণ দেখে অনেকেই তাকে রুক্ষ বা অভদ্র মনে করেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন একজন মানুষ।
সম্প্রতি ফরাসি ওপেনের কোয়ার্টার ফাইনালে নাটকীয়ভাবে হারের পর সংবাদ সম্মেলনে সাবালেঙ্কা বলেছিলেন, ‘তার টেনিস ছেড়ে দিতে ইচ্ছা করছে।’ পরে সেই মন্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘সেটি ছিল হারের হতাশা থেকে বেরিয়ে আসা আবেগের প্রকাশ।’ সংবাদ সম্মেলনে যাওয়ার আগে প্রায় দেড় ঘণ্টা নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। তবুও সেখানে গিয়ে বলে ফেলেন, ‘এই মুহূর্তে টেনিস ছেড়ে দিতে ইচ্ছা করছে।’
তার ভাষায়, এমন পরিস্থিতিতে নিজের প্রকৃত অনুভূতিই প্রকাশ করেছিলেন তিনি। পরে অবশ্য বুঝতে পারেন, ওই মন্তব্য অনেক বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সাবালেঙ্কা বলেন, ‘কোর্টে তার রাগ, চিৎকার কিংবা র্যাকেট ছুড়ে ফেলার দৃশ্য দেখে মানুষ তাকে ভুল বোঝে। এমনকি স্পেনের টেনিস খেলোয়াড় ও তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু পাওলা বাদোসাও প্রথম দেখায় তাকে অভদ্র ভেবেছিলেন। পরে পরিচয় হওয়ার পর দুজনই বুঝতে পারেন, তাদের ধারণা ভুল ছিল।’
নিজের চেহারা নিয়েও খোলামেলা কথা বলেন সাবালেঙ্কা। তিনি বলেন, ‘তার স্বাভাবিক মুখভঙ্গি অনেক সময় কঠোর ও রাগী দেখায়। তাই প্রথম দেখায় অনেকের মনে হয় তিনি অহংকারী বা মানুষের সঙ্গে মিশতে চান না। তবে কাছ থেকে পরিচয় হলে সবাই বুঝতে পারেন, আমি আসলে হাসিখুশি, মিশুক এবং রসবোধসম্পন্ন একজন মানুষ।’
বেলারুশের রাজধানী মিনস্কে বেড়ে ওঠা সাবালেঙ্কা জানান, ছোটবেলায় তিনি ছিলেন খুবই চঞ্চল। তাকে সঠিক পথে রাখতেই বাবা ছয় বছর বয়সে টেনিস কোর্টে নিয়ে যান। সেখান থেকেই শুরু হয় তার টেনিস-যাত্রা। বাবা নিজে পেশাদার টেনিস খেলোয়াড় না হলেও সবসময় তাকে উৎসাহ দিয়েছেন। স্কুলজীবনেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। বিশেষ করে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানে সব সময় সেরা ফল করতেন। পরে টেনিসের জন্যই পড়াশোনার চেয়ে খেলাকেই বেশি গুরুত্ব দেন।
২০১৯ সালে মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত হয়ে তার বাবা সের্গেই সাবালেঙ্কার মৃত্যু হয়। বাবার সঙ্গে তার একটি স্বপ্ন ছিল ২৫ বছর বয়স হওয়ার আগেই দুটি গ্র্যান্ড স্ল্যাম জিতবেন। বাবার মৃত্যুর পর সেই স্বপ্নই তার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ২০২৩ ও ২০২৪ সালে অস্ট্রেলিয়ান ওপেন এবং ২০২৪ ও ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ওপেন জিতে বাবার স্বপ্ন পূরণ করেন তিনি।
কোর্টে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণের লড়াই এখনও শেষ হয়নি বলেও স্বীকার করেছেন সাবালেঙ্কা। তবে আগের তুলনায় এখন অনেক বেশি পরিণত হয়েছেন বলে মনে করেন। তার মতে, মাঝে মাঝে চিৎকার করা বা র্যাকেট ছুড়ে ফেলা তার জন্য চাপ কমানোর একটি উপায়। সব আবেগ ভেতরে চেপে রাখলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
তিনি বলেন,‘টেনিস এমন একটি খেলা, যেখানে খেলোয়াড়কে একাই সব চাপ সামলাতে হয়। তাই কখনো কখনো নিজের রাগ বা হতাশা প্রকাশ করাটা তার জন্য প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। তবে বাস্তব জীবনে আমি ঝগড়া-বিবাদ এড়িয়ে চলতেই পছন্দ করেন। বরং চারপাশে আনন্দ ছড়িয়ে দিতে ভালো লাগে তার।’
২০২৫ সালের ফরাসি ওপেনের ফাইনালে কোকো গফের কাছে হারের পর প্রতিপক্ষের সাফল্যকে যথাযথ স্বীকৃতি না দিয়ে মন্তব্য করেছিলেন সাবালেঙ্কা। পরে নিজের ভুল বুঝতে পেরে গফের কাছে ক্ষমা চান। এরপর দুজন একসঙ্গে নাচের ভিডিও প্রকাশ করে সেই বিতর্কের ইতি টানেন।
ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও কম আলোচনা হয়নি তাকে ঘিরে। চলতি বছর ব্রাজিলের ব্যবসায়ী জর্জিওস ফ্রাঙ্গুলিসের সঙ্গে বাগদান সম্পন্ন হয়েছে তার। এর আগে সাবেক প্রেমিক, আইস হকি খেলোয়াড় কনস্তান্তিন কোলৎসভের মৃত্যুও তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।
ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বেলারুশ ও রাশিয়ার খেলোয়াড়দের সঙ্গে ইউক্রেনীয়দের করমর্দন না করার বিষয়েও নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন সাবালেঙ্কা। তিনি বলেন, খেলাধুলা ও রাজনীতিকে আলাদা রাখা উচিত। তবে যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনীয় খেলোয়াড়দের অনুভূতিকেও তিনি সম্মান করেন।

