সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থের সংস্থান

0
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থের সংস্থান

জাতীয় বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি একটি সরকারের অর্থনৈতিক দর্শন, রাজনৈতিক অগ্রাধিকার এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রতিফলন। নির্বাচনের পর প্রথম বাজেট সাধারণত বিশেষ গুরুত্ব বহন করে, কারণ এর মধ্য দিয়েই নতুন সরকার তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের রূপরেখা তুলে ধরে।

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটও সেই অর্থে একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বার্তা বহন করছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এই উচ্চাভিলাষী বাজেটের অর্থায়ন কতটা বাস্তবসম্মত? 

অন্তর্বর্তী সরকারের চলতি অর্থবছরের বাজেট ছিল সাত লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। সে তুলনায় নতুন বাজেটের আকার প্রায় ১৯ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশের বাজেট ইতিহাসে এটি একটি উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি।

সাধারণত বাজেটের আকার ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেত। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আয়ের উৎস কি সরকার নিশ্চিত করতে পারবে?

এই বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিঃসন্দেহে অর্থের সংস্থান। আগামী অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২৩ শতাংশ বেশি। বাস্তবতা হলো, চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায় পাঁচ লাখ কোটি টাকাও অতিক্রম করবে না বলে অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারাই ধারণা করছেন।

অর্থাৎ প্রকৃত আদায় এবং আগামী বছরের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ব্যবধান প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা। 

আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে আগামী অর্থবছরে ছয় লাখ চার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হচ্ছে। অথচ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তাদের প্রকৃত আদায় ছিল মাত্র তিন লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই সংস্থাটির রাজস্ব ঘাটতি প্রায় এক লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এই বাস্তবতায় রাজস্ব আদায়ে প্রায় দ্বিগুণ প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী বলেই মনে হয়।

সমস্যা শুধু রাজস্বে নয়, বাজেটের ব্যয়কাঠামোও ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হচ্ছে। নির্বাচনী পতিশ্রুতির অংশ হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির আওতায় ৪১ লাখ নারীপ্রধান পরিবারকে মাসিক ভাতা দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কৃষক সহায়তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের উদ্যোগ রয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে এক লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা করা হচ্ছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে।

সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ অবশ্যই একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু এর সঙ্গে অর্থনৈতিক সক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখা সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বলছে, বরাদ্দ বৃদ্ধি সব সময় উন্নত সেবা নিশ্চিত করে না। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের তুলনায় বাস্তবায়নের সক্ষমতা দীর্ঘদিন ধরেই সীমিত। প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা নতুন বরাদ্দের কার্যকারিতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।

একই সময়ে সরকারকে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সারের ভর্তুকির চাপও বহন করতে হবে। কৃচ্ছ্রসাধন নীতি থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসার রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ রয়েছে। ফলে একদিকে ভর্তুকি ব্যয়, অন্যদিকে উন্নয়ন ব্যয় দুই দিক থেকেই সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ বাড়বে।

অর্থায়নের ঘাটতি পূরণে সরকার দেশি ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীল হতে পারে। কিন্তু এখানেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ব্যাংক খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিলে বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা কমে যেতে পারে। অন্যদিকে বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রেও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের দুর্বলতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বর্তমানে দেশে মূল্যস্ফীতি এখনো স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে নামেনি। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। কিন্তু একই সময়ে যদি সরকার সম্প্রসারণমূলক রাজস্বনীতি গ্রহণ করে, তাহলে নীতিগত সমন্বয়ের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা দুর্বল হয়ে পড়বে।

বাজেটের সাফল্য কখনোই তার আকার দিয়ে বিচার করা যায় না। বরং আয় ও ব্যয়ের মধ্যে বাস্তবসম্মত ভারসাম্য, প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতা এবং রাজস্ব আহরণের সক্ষমতাই একটি বাজেটের কার্যকারিতা নির্ধারণ করে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, কিন্তু অর্থনৈতিক বাস্তবতাকেও উপেক্ষা করা যায় না।

নতুন বাজেট নিঃসন্দেহে উচ্চাভিলাষী। এতে সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের ইতিবাচক লক্ষ্য রয়েছে। তবে এসব লক্ষ্য অর্জনের পূর্বশর্ত হলো টেকসই অর্থায়ন। রাজস্ব সংগ্রহে মৌলিক সংস্কার, ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহি নিশ্চিত না করা গেলে এই বৃহৎ বাজেট অর্থনীতির জন্য প্রত্যাশিত সুফলের পরিবর্তে নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে আগামী অর্থবছরে সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে বাজেট ঘোষণা নয়, বরং এর অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। এ ছাড়া বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে দেখা গেছে, বরাদ্দের অভাবে নয়, বরং দুর্বল পরিকল্পনা, ক্রয়প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণে অনেক উন্নয়ন কর্মসূচি প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি। ফলে আগামী বাজেটে অর্থায়নের পাশাপাশি ব্যয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করাও সরকারের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হবে।

লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here