সত্যিই কি তেলসমৃদ্ধ আলবার্টা প্রদেশ স্বাধীন হতে পারবে? কানাডায় গণভোটের আয়োজন

0
সত্যিই কি তেলসমৃদ্ধ আলবার্টা প্রদেশ স্বাধীন হতে পারবে? কানাডায় গণভোটের আয়োজন

কানাডার পশ্চিমাঞ্চলীয় তেলসমৃদ্ধ প্রদেশ আলবার্টা স্বাধীন হওয়ার পথে এগোবে কি না, সে বিষয়ে আগামী অক্টোবর মাসে গণভোট আয়োজনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বিষয়টিকে শুধু আলবার্টার ভবিষ্যৎ নয়, বরং পুরো কানাডার জাতীয় ঐক্যের জন্যও গত কয়েক দশকের অন্যতম বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

গণভোটে ভোটারদের কাছে জানতে চাওয়া হবে, আলবার্টা কি কানাডার অংশ হিসেবেই থাকবে, নাকি কানাডার সংবিধান অনুযায়ী স্বাধীনতার বিষয়ে একটি চূড়ান্ত আইনি গণভোট আয়োজনের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।

গত ২১ মে এক টেলিভিশন ভাষণে আলবার্টার প্রিমিয়ার অর্থাৎ প্রদেশের সরকার প্রধান ড্যানিয়েল স্মিথ এই ভোট আয়োজনের ঘোষণা দেন। তবে তিনি ব্যক্তিগতভাবে অবিভক্ত কানাডার পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন বলে জানান।

দীর্ঘদিন ধরেই আলবার্টায় বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাব জোরালো হয়ে উঠছে। স্বাধীনতার দাবিতে তিন লাখের বেশি মানুষের স্বাক্ষরসংবলিত একটি পিটিশনের পরই গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বর্তমানে আলবার্টার জনসংখ্যা প্রায় ৫০ লাখ।

প্রিমিয়ারের দপ্তর জানিয়েছে, ভোটারদের সামনে দুটি বিকল্প থাকবে—একটি কানাডার অংশ হিসেবে থাকা, অন্যটি স্বাধীনতা নিয়ে চূড়ান্ত গণভোট আয়োজনের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা।

এই পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে আলবার্টার একাংশের দীর্ঘদিনের অভিযোগ। তাদের দাবি, কানাডার কেন্দ্রীয় সরকার প্রদেশটির অর্থনৈতিক অবদান অনুযায়ী যথেষ্ট সুবিধা দেয় না এবং অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ করে। বিশেষ করে পরিবেশগত নানা বিধিনিষেধের কারণে তেল ও পাইপলাইন প্রকল্প বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে তারা মনে করেন।

বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের নেতৃত্বে রয়েছেন ‘আলবার্টা প্রোসপারিটি প্রজেক্ট’-এর সঙ্গে যুক্ত বনিভিলের ব্যবসায়ী মিচ সিলভেস্টার এবং ক্যালগেরির আইনজীবী জেফরি রাথ। তাদের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির কারণে আলবার্টার তেলভিত্তিক অর্থনীতি কাঙ্ক্ষিতভাবে এগোতে পারেনি।

এদিকে আলবার্টার আদালত সম্প্রতি স্বাধীনতার পক্ষে স্বাক্ষর সংগ্রহের পিটিশন স্থগিত করেছিল। আদালতের মতে, সম্ভাব্য বিচ্ছিন্নতার প্রভাব নিয়ে আদিবাসী জনগোষ্ঠী বা ফার্স্ট নেশন্স সম্প্রদায়ের সঙ্গে যথাযথ আলোচনা হয়নি। আদিবাসী নেতারাও আদালতের রায় উপেক্ষা করে গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্তকে ‘গণতান্ত্রিক রীতিনীতির পরিপন্থী’ বলে সমালোচনা করেছেন।

অন্যদিকে, আলবার্টার সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী টমাস লুকাজুকের নেতৃত্বে ‘ফরেভার কানাডিয়ান’ নামে একটি সংগঠন আলাদা না হওয়ার পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে। তাদের পিটিশনে প্রায় চার লাখ মানুষ স্বাক্ষর করেছেন।

প্রিমিয়ার স্মিথ জানিয়েছেন, আদালতের রায় নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন হলেও আলবার্টার মানুষের মত প্রকাশের অধিকারকে বাধাগ্রস্ত হতে দিতে চান না। তার সরকার ইতোমধ্যে আদালতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেছে।

গণভোটের ঘোষণা ঘিরে এখন আলবার্টাজুড়ে রাজনৈতিক প্রচারণা আরও তীব্র হওয়ার আভাস মিলছে। যদিও স্মিথ স্পষ্ট করেছেন, স্বাধীনতার পক্ষে ভোট এলেও তাৎক্ষণিকভাবে আলবার্টা কানাডা থেকে আলাদা হয়ে যাবে না; বরং আরও জটিল আইনি ও সাংবিধানিক ধাপ পার হতে হবে।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি আলবার্টাকে কানাডার গুরুত্বপূর্ণ অংশ উল্লেখ করে ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। একইভাবে বিরোধী কনজারভেটিভ নেতা পিয়ের পোলিভিয়ারও কানাডার ঐক্যের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

তবে স্বাধীনতাকামী নেতা জেফরি রাথ গণভোটের বর্তমান কাঠামো নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তার দাবি, স্বাধীনতার বিষয়ে সরাসরি ও স্পষ্ট প্রশ্ন না থাকায় জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।

বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, আলবার্টার অধিকাংশ মানুষ এখনো কানাডার অংশ হিসেবেই থাকতে চান। চলতি বছরের বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী, স্বাধীনতার পক্ষে সমর্থন ২৬ থেকে ২৮ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। 

জরিপগুলো অনুযায়ী, আলবার্টার বেশিরভাগ মানুষই চান যে তারা কানাডার অংশ হয়েই থাকবেন। জানুয়ারি মাসের ‘ইপসোস’-এর একটি জরিপ মতে, স্বাধীনতার পক্ষে মাত্র ২৮ শতাংশ লোক ‘হ্যাঁ’ ভোট দেবেন বলে জানা গেছে। তবে মজার ব্যাপার হলো, এই ২৮ শতাংশের মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ লোক মনে করেন তাদের এই সমর্থন আসলে স্রেফ একটা প্রতীকী সমর্থন বা তারা শর্তসাপেক্ষে এটা চান—অর্থাৎ, সত্যিকার অর্থেই আলবার্টাকে আলাদা করার ব্যাপারে তারা এখনো ১০০ ভাগ নিশ্চিত নন।

মার্চ মাসে ‘অ্যাবাকাস ডেটা’-এর একটি জরিপেও অনেকটা একই ফল দেখা যায়, যেখানে ২৬ শতাংশ লোক এই স্বাধীনতার পক্ষে তাদের মত জানিয়েছেন। আবার গত এপ্রিলে প্রকাশিত সিবিসির আরেকটা জরিপ বলে দিচ্ছে যে, গত এক বছর ধরে আলবার্টার স্বাধীন হওয়ার এই ইচ্ছায় বড় ধরনের কোনো বাড়তি আগ্রহ দেখা যায়নি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here