শতবর্ষেও অদম্য ডেভিড অ্যাটেনবরো, প্রকৃতিকে নতুন করে চিনিয়েছে যার ক্যামেরা

0
শতবর্ষেও অদম্য ডেভিড অ্যাটেনবরো, প্রকৃতিকে নতুন করে চিনিয়েছে যার ক্যামেরা

শতবর্ষে পা রাখা ডেভিড অ্যাটেনবরো আজ বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানিত প্রকৃতিবিদদের একজন। শান্ত, স্থির ও বিশ্বাসযোগ্য কণ্ঠে তিনি দশকের পর দশক ধরে মানুষকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন পৃথিবীর বিস্ময়কর জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে। তবে তার ৭০ বছরের কর্মজীবনের ইতিহাস শুধু একজন উপস্থাপকের গল্প নয়; এটি এক সাহসী উদ্ভাবকের গল্প, যিনি বারবার ঝুঁকি নিয়ে বদলে দিয়েছেন প্রকৃতি বিষয়ক টেলিভিশন নির্মাণের ধরন।

সাদাকালো টেলিভিশনের যুগ থেকে শুরু করে ভার্চুয়াল রিয়ালিটি (ভিআর) প্রযুক্তি পর্যন্ত প্রতিটি বড় প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিয়েছেন অ্যাটেনবরো। নতুন প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্গম অঞ্চল, গভীর সমুদ্র ও অজানা প্রাণিজগতকে মানুষের ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন।

বিবিসিতে যোগদান
ক্যারিয়ারের শুরুতে অ্যাটেনবরো শিশুদের বিজ্ঞানবিষয়ক বই সম্পাদনার কাজ করতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই কাজে একঘেয়েমি চলে আসে। পরে তিনি বিবিসি রেডিওতে চাকরির আবেদন করেন। প্রথমে আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলেও কিছুদিন পর বিবিসির নতুন টেলিভিশন বিভাগে কাজের প্রস্তাব পান তিনি।

তখন টেলিভিশনের অধিকাংশ অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার হতো। এই সময় অ্যাটেনবরো নতুন ধারণা নিয়ে আসেন- স্টুডিও উপস্থাপনার সঙ্গে বাস্তব লোকেশনে ধারণ করা বন্যপ্রাণীর ফুটেজ মিলিয়ে অনুষ্ঠান তৈরি। এভাবেই জন্ম নেয় জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘জু কোয়েস্ট’।

এই অনুষ্ঠানের জন্য তিনি নিজেই অভিযানে অংশ নিতেন এবং বিরল প্রাণী খুঁজে এনে লন্ডন চিড়িয়াখানায় পাঠাতেন। পরবর্তীতে তিনি স্বীকার করেন, আজকের পৃথিবীতে এমন কাজ আর গ্রহণযোগ্য হতো না।

অ্যাটেনবরো বলেন, “তখন আমরা ভাবতাম প্রকৃতি অশেষ সম্পদে ভরা। কোনও প্রাণী মারা গেলে আবার জঙ্গল থেকে এনে রাখা যেত। এখন আর তা কল্পনাও করা যায় না।”

বিরল প্রাণী ধারণে পথিকৃৎ
তার দলই প্রথমবারের মতো ক্যামেরাবন্দি করে বিরল সাদা-ঘাড় রকফাউল পাখি এবং রহস্যময় কোমোডো ড্রাগনকে। তখন পর্যন্ত কোমোডো ড্রাগন সম্পর্কে বিশ্বের সাধারণ মানুষের ধারণা ছিল খুবই সীমিত।

এইসব অভিযানের মধ্য দিয়েই প্রকৃতির প্রতি অ্যাটেনবরোর গভীর অনুরাগ গড়ে ওঠে। পরবর্তী কয়েক দশকে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ঘুরে প্রকৃতির অসাধারণ বৈচিত্র্য তুলে ধরেন তিনি।

রঙিন টেলিভিশনের বিপ্লব
১৯৫২ সালে বিবিসিতে যোগ দেওয়ার সময় অ্যাটেনবরোর নিজের বাড়িতেই কোনও টেলিভিশন ছিল না। অথচ মাত্র ১৫ বছরের মধ্যে তিনি হয়ে ওঠেন ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশনের (বিবিসি) দ্বিতীয় ফ্ল্যাগশিপ চ্যানেল ‘বিবিসি টু’-এর নিয়ন্ত্রক।

তার অন্যতম বড় অবদান ছিল ইউরোপে রঙিন টেলিভিশন সম্প্রচার চালু করা। জার্মানিকে পেছনে ফেলে বিবিসিকে প্রথম রঙিন সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

তিনি পরে স্মৃতিচারণ করে বলেন, “উইম্বলডনের সময় মাত্র চারটি রঙিন ক্যামেরা দিয়ে আমরা সম্প্রচার শুরু করেছিলাম। আর জার্মানরা এতে ভীষণ বিরক্ত হয়েছিল।”

ডকুমেন্টারির নতুন যুগ
রঙিন সম্প্রচারের পর অ্যাটেনবরো আরও উচ্চাভিলাষী প্রকল্প হাতে নেন। ১৯৬৯ সালে তিনি শিল্প ইতিহাসবিদ কেনেথ ক্লার্ককে নিয়ে তৈরি করেন বিখ্যাত ধারাবাহিক ‘সিভিলাইজেশন’। এটি ছিল টেলিভিশনের প্রথম বড় বাজেটের ডকুমেন্টারিগুলোর একটি।

এরপর আসে ‘দ্য অ্যাসেন্ট অফ ম্যান’, যেখানে বিজ্ঞান ও মানব সভ্যতার বিবর্তনের ইতিহাস তুলে ধরা হয়।

‘লাইফ অন আর্থ’: প্রকৃতি বিষয়ক টেলিভিশনের মোড় ঘোরানো সিরিজ
প্রশাসনিক দায়িত্ব ছেড়ে অ্যাটেনবরো আবার ক্যামেরার সামনে ফেরেন। বহুদিন ধরেই প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে বড় আকারের ধারাবাহিক নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল তার।

চার বছর ধরে ১০০টিরও বেশি স্থানে চিত্রধারণের পর তৈরি হয় ঐতিহাসিক সিরিজ লাইফ অন আর্থ। ১৯৭৯ সালে প্রচারিত এই সিরিজ প্রথমবারের মতো বিবর্তনের আলোকে প্রাণিজগতের বৈচিত্র্য ব্যাখ্যা করে।

এটি ছিল প্রথম প্রকৃতি বিষয়ক টিভি সিরিজ যার নির্মাণ ব্যয় ১০ লাখ পাউন্ড ছাড়িয়ে যায়।

রুয়ান্ডায় পাহাড়ি গরিলাদের সঙ্গে অ্যাটেনবরোর একটি দৃশ্য টেলিভিশনের ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে আছে। গরিলাদের সঙ্গে সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বলেন, “মনে হয়েছিল সময় থেমে গেছে। যেন আমি স্বর্গে আছি।”

প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার
২০০১ সালের ‘দ্য ব্লু প্লানেট’ সিরিজে অত্যাধুনিক লো-লাইট ক্যামেরা ব্যবহার করে গভীর সমুদ্রের এমন সব প্রাণী দেখানো হয়, যেগুলো আগে কখনও ধারণ করা সম্ভব হয়নি।

এরপর ২০০৬ সালে প্রচারিত ‘প্লানেট আর্থ’ ছিল বিবিসির ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকৃতি বিষয়ক ডকুমেন্টারি। সামরিক প্রযুক্তির স্থিতিশীল ক্যামেরা ব্যবহার করে হেলিকপ্টার থেকে প্রাণীদের আচরণ ধারণ করা হয়, যাতে তারা বিরক্ত না হয়।

অ্যাটেনবরোই একমাত্র ব্যক্তি যিনি সাদাকালো, রঙিন, এইচডি, থ্রিডি এবং ৪কে- সব ধরনের প্রযুক্তিতে নির্মিত অনুষ্ঠানের জন্য বাফটা অ্যাওয়ার্ডস জিতেছেন।

৮৯ বছর বয়সে গভীর সমুদ্রে অভিযান
২০১৫ সালে, ৮৯ বছর বয়সে, তিনি অস্ট্রেলিয়ার কোরাল সাগরের ‘গ্রেট ব্যারিয়ার রিফে’ ১ হাজার ফুট গভীরে সাবমার্সিবল ডাইভ দিয়ে নতুন রেকর্ড গড়েন। এটি বিশ্বের বৃহত্তম প্রবাল প্রাচীর ব্যবস্থা, যা অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড উপকূলের উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত।

এই অভিযানের ভিডিও ধারণ করা হয় নতুন টেলিভিশন সিরিজ ও ভার্চুয়াল রিয়ালিটি অভিজ্ঞতার জন্য, যা তৈরি হয়েছিল ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের সহযোগিতায়।

বিজ্ঞানের জগতে প্রভাব
অ্যাটেনবরোর কাজ অসংখ্য বিজ্ঞানীকে অনুপ্রাণিত করেছে। তিনি নিজেই বলেছেন, বিশ্বের নানা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা তাকে জানিয়েছেন যে ‘লাইফ অন আর্থ’ দেখেই তারা প্রাণিবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেছিলেন।

তার সম্মানে ইতোমধ্যে ৫০টিরও বেশি প্রাণী ও উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নামকরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাঙ, গুবরে পোকা, প্রজাপতি, এমনকি মাংসাশী উদ্ভিদও।

২০২৫ সালে একটি ছত্রাকের নামও তার নামে রাখা হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সরব
ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে সংরক্ষণবাদী হলেও ২০০০ সালের পর থেকে অ্যাটেনবরোর কাজ আরও সরাসরি পরিবেশ সংকটের দিকে মনোযোগ দিতে শুরু করে।

২০০৬ সালে তিনি জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বিবিসির বিশেষ অনুষ্ঠানমালায় অংশ নিয়ে বলেন, “একসময় আমি জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সন্দিহান ছিলাম। কিন্তু এখন আর কোনও সন্দেহ নেই। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।”

২০১৯ সালে, ৯৩ বছর বয়সে, তিনি গ্লাস্টনবেরি ফেস্টিভ্যালে লাখো দর্শকের সামনে পরিবেশ রক্ষার বার্তা দেন। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করার উদ্যোগের প্রশংসা করে তিনি দর্শকদের প্রকৃতি রক্ষায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

এখনও শোনান আশার কথা
শত বছর বয়সেও অ্যাটেনবরো বিশ্ববাসীকে মনে করিয়ে দেন- প্রকৃতিকে রক্ষা করার দায়িত্ব মানুষেরই। আন্তর্জাতিক রাজনীতিকদের সম্মেলন হোক কিংবা কোনও শিশুর সঙ্গে আলাপ, তিনি সবসময় একই বার্তা দেন- এখনও সময় ফুরিয়ে যায়নি, চাইলে পৃথিবীকে রক্ষা করা সম্ভব। সূত্র: বিবিসি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here