প্রবাসী আয় বাড়া এবং বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতির কিছু উন্নতি হওয়ায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে এখনো কিছুটা স্বস্তির আভাস মিলছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবশেষ হিসাব বলছে, ১০ জুন পর্যন্ত দেশের গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৪ হাজার ৭৩৪ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব পদ্ধতি বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ৭৭ দশমিক ৯৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এই ইতিবাচক চিত্রের আড়ালে কিছু দুর্বলতা রয়েছে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বলছে, বৈদেশিক লেনদেনের উন্নতির বড় অংশই এসেছে ঋণনির্ভর উৎস থেকে। অর্থাৎ নিজস্ব আয় বাড়ার চেয়ে ধার করা অর্থ দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হচ্ছে। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘রিজার্ভ বাড়া অবশ্যই ভালো খবর। যদি এ বৃদ্ধি ঋণ বা সাময়িক উৎস থেকে আসে, তাহলে সেটি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না। আমাদের নজর দিতে হবে রপ্তানি ও উৎপাদন বাড়ানোর দিকে।’ নতুন বাজেটে প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে রাজস্বের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এ ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি, বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস রপ্তানি খাত প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়ছে না। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি আয় কমেছে প্রায় ২ শতাংশ। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে এ ধীরগতি বেশি চোখে পড়ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) মোট রপ্তানি আয় হয়েছে ৪৩ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪৪ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার। রপ্তানি না বাড়লে রিজার্ভ শক্ত ভিত্তি পায় না। ফলে সামগ্রিক অর্থনীতি ঝুঁকির মধ্যে থেকেই যায়। বিনিয়োগ পরিস্থিতিও খুব আশাব্যঞ্জক নয়। নতুন শিল্প স্থাপন বা যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি দুটিই কমেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, জিডিপির সঙ্গে মোট বিনিয়োগের অনুপাত কমে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ২৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরে বিনিয়োগ কমেছে শূন্য দশমিক ৬১ শতাংশ পয়েন্ট। এতে বোঝা যায়, উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে কিছুটা পিছিয়ে আছেন। এর প্রভাব ভবিষ্যতে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ওপর পড়তে পারে। এর পাশাপাশি বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপও দ্রুত বাড়ছে। সিপিডির তথ্যানুযায়ী, ২০২০ সালে যেখানে ঋণ পরিশোধ ছিল ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার, তা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ আগামী বছরগুলোতে আরও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা ঋণ শোধে ব্যয় করতে হবে, যা রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শুধু রিজার্ভের পরিমাণ বাড়লেই হবে না, এর উৎস কতটা টেকসই সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। যদি রপ্তানি ও উৎপাদনের মতো স্থায়ী উৎস থেকে বৈদেশিক আয় না বাড়ে, তাহলে এ রিজার্ভ দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারবে না।

