নাসার অত্যন্ত গোপনীয় এবং স্পর্শকাতর প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত অন্তত ১০ জন বিজ্ঞানীর রহস্যজনক মৃত্যু এবং নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় বর্তমানে উত্তাল হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞান ও রাজনীতি অঙ্গন। মহাকাশ গবেষণা, পারমাণবিক শক্তি এবং ইউএফও সংক্রান্ত গবেষণায় নিয়োজিত এই গবেষকদের জীবন ও অন্তর্ধান নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর ধোঁয়াশা। অনেকের কাছেই জনপ্রিয় সাই-ফাই সিরিজ ‘দ্য এক্স-ফাইলস’-এর বাস্তব রূপ বলে মনে হচ্ছে।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, নিখোঁজ বা মৃত এই বিজ্ঞানীদের মধ্যে চারজন সরাসরি নাসার হয়ে কাজ করতেন এবং তাদের মধ্যে তিনজন ছিলেন একই গবেষক দলের সদস্য। এছাড়া দুজন বিজ্ঞানী নিউ মেক্সিকোর একই ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে কর্মরত ছিলেন। এমনকি একজন সাবেক বিমানবাহিনী প্রকৌশলী, যিনি অবসরের পর ইউএফও গবেষণায় নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন, তিনিও গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে নিখোঁজ রয়েছেন।
বিজ্ঞানীদের এই অস্বাভাবিক মৃত্যুর মিছিল শুরু হয় ২০২৩ সালের গ্রীষ্মে, যখন নাসার জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরির বর্ষীয়ান বিজ্ঞানী মাইকেল ডেভিড হিকসের মৃত্যু হয়। ৫৯ বছর বয়সী হিকস প্রায় ২৫ বছর ধরে ধুমকেতু ও গ্রহাণু নিয়ে গবেষণা করছিলেন এবং ১৯৯৮ সালের গুরুত্বপূর্ণ ‘ডিপ স্পেস ১’ মিশনের সদস্য ছিলেন। তবে তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি।
হিকসের মৃত্যুর ঠিক এক বছর পর ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তার এক সহকর্মী ফ্র্যাঙ্ক মাইওয়াল্ড লস অ্যাঞ্জেলেসে নিজের বাড়িতে মৃত অবস্থায় উদ্ধার হন। জার্মান বংশোদ্ভূত এই বিজ্ঞানী নাসার দীর্ঘদিনের সহযোগী হিসেবে অত্যন্ত সম্মানজনক অবস্থানে ছিলেন। হিকস এবং মাইওয়াল্ডের মৃত্যুর মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা নিয়ে তখনই প্রাথমিক গুঞ্জন শুরু হয়েছিল।
রহস্যের মাত্রা আরও বেড়ে যায় ২০২৫ সালের জুনে, যখন নাসার জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরির ম্যাটেরিয়াল প্রসেসিং গ্রুপের পরিচালক মনিকা রেজা ক্যালিফোর্নিয়ার একটি বনে হাইকিং করতে গিয়ে নিখোঁজ হন। উদ্ধারকারী দল টানা কয়েক দিন তল্লাশি চালিয়েও তার কোনো হদিস পায়নি। মজার ব্যাপার হলো, মনিকা রেজার কিছু গবেষণা প্রকল্পের অর্থায়ন করেছিল বিমানবাহিনীর একটি ল্যাবরেটরি।
ঠিক সেই বিমানবাহিনী ল্যাবরেটরির সাবেক কমান্ডার উইলিয়াম নিল ম্যাককাসল্যান্ড গত ফেব্রুয়ারিতে অদ্ভুতভাবে নিখোঁজ হয়ে যান। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় তিনি তার চশমা ও মোবাইল ফোন ফেলে গেলেও সাথে নিয়েছিলেন হাইকিং বুট ও একটি পিস্তল। ম্যাককাসল্যান্ডের স্ত্রী জানান, তার স্বামী একসময় অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও ক্লাসিফাইড তথ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং অবসরের পর তিনি ইউএফও বিষয়ক গবেষণায় পরামর্শক হিসেবে কাজ করতেন।
নিখোঁজ ও মৃত্যুর এই তালিকায় কেবল নাসা নয়, যুক্ত হয়েছে নিউ মেক্সিকোর লস আলামস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিও। এই ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানী কাসিয়াস এবং সাবেক ফোরম্যান শাভেজ পৃথক সময়ে নিখোঁজ হন। কাসিয়াস তার চাবি, ফোন ও ব্যাগ বাড়িতে রেখেই উধাও হয়ে যান, যা তদন্তকারীদের ভাবিয়ে তুলেছে যে এটি কোনো পরিকল্পিত অপহরণ কি না।
এরই মধ্যে ম্যাসাচুসেটসে আরেকজন প্রতিভাবান পরমাণু বিজ্ঞানী ও এমআইটি অধ্যাপক নুনো লরেইরো নিজ অ্যাপার্টমেন্টে গুলিতে নিহত হন। যদিও এফবিআই দাবি করেছে যে তিনি একটি গণশুটিংয়ের শিকার হয়েছিলেন, তবে অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করেন মহাকাশ ও ফিউশন এনার্জি নিয়ে তার করা গবেষণাই তাকে টার্গেটে পরিণত করেছে।
অনুরূপ এক ঘটনায় ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির জ্যোতির্পদার্থবিদ কার্ল গ্রিলমায়ারকে তার বাড়ির বারান্দায় গুলি করে হত্যা করা হয়। গ্রিলমায়ারও নাসার অংশীদারিত্বে বিভিন্ন মহাকাশ প্রকল্পে যুক্ত ছিলেন। তার এই অস্বাভাবিক মৃত্যু মহাকাশ গবেষণা অঙ্গনে এক আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে।
ষড়যন্ত্রতত্ত্বের পালে হাওয়া দিচ্ছে অ্যামি এসক্রিজ নামক এক তরুণ বিজ্ঞানীর মৃত্যু। তিনি কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং গ্র্যাভিটি মডিফিকেশন নিয়ে কাজ করছিলেন, যা প্রচলিত বিজ্ঞানের সীমানাকে চ্যালেঞ্জ করে। ৩২ বছর বয়সী এই বিজ্ঞানীর মৃত্যু ও গবেষণার ধরণ নিয়ে ইন্টারনেটে অসংখ্য তত্ত্ব ঘুরে বেড়াচ্ছে।
তদন্তের তালিকায় থাকা আরেকটি নাম হলো স্টিভেন গার্সিয়া, যিনি মার্কিন সেনাবাহিনীর পারমাণবিক অস্ত্রের যন্ত্রাংশ তৈরি করা এক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা তদারকির দায়িত্বে ছিলেন। তার নিখোঁজ হওয়ার ধরণ অনেকটা সাবেক জেনারেল ম্যাককাসল্যান্ডের মতোই। গার্সিয়াও তার পিস্তল নিয়ে রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে যান, যা কোনো বড় ধরণের ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এদিকে ম্যাথিউ জেমস সুলিভান নামক এক সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তার মৃত্যু নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করেছে। ইউএফও সংক্রান্ত একটি ফেডারেল হুইসেলব্লোয়ার মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার মাত্র দুই সপ্তাহ আগে তিনি আত্মহত্যা করেন বলে দাবি করা হয়েছে। তবে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা এই আত্মহত্যার দাবি মেনে নিতে নারাজ।
এই পরিস্থিতিতে এফবিআই পরিচালক ক্যাশ প্যাটেল ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, তারা প্রতিটি মামলার গভীর তদন্ত করবেন। বিশেষ করে বিজ্ঞানীদের গোপনীয় তথ্যে প্রবেশাধিকার এবং কোনো বিদেশি শক্তির হাত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে, কোনো নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে রিপাবলিকান নেতা জেমস কোমার মনে করেন, এই সব ঘটনাকে কেবল কাকতালীয় বলে উড়িয়ে দেওয়া অসম্ভব। হাউস ওভারসাইট কমিটি ইতোমধ্যে প্রতিরক্ষা বিভাগ, নাসা এবং এফবিআইকে চিঠি পাঠিয়ে একটি “ভয়ঙ্কর সংযোগের” সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার জন্য চাপ দিচ্ছে। তারা মনে করছেন, পর্দার আড়ালে কোনো বড় তথ্য গোপনের চেষ্টা চলছে।
বিজ্ঞানীদের পরিবারগুলো অবশ্য দ্বিধাবিভক্ত। কেউ কেউ মনে করছেন এটি নিছক সাধারণ ঘটনা এবং এর মধ্যে কোনো ষড়যন্ত্র নেই। আবার অনেকের কাছেই তাদের আপনজনদের এভাবে চলে যাওয়া এক অমীমাংসিত রহস্য।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

