প্রকৃতি কখনো জীবন ও জীবিকার আশীর্বাদ, আবার কখনো ধ্বংসের নির্মম বার্তা। কৃষিনির্ভর রংপুর অঞ্চলের ইতিহাসে প্রকৃতির এই দুই রূপই বারবার দেখা গেছে। কখনো অনাবৃষ্টি, কখনো বন্যা, আবার কখনো ভূমিকম্প কিংবা দুর্ভিক্ষের আঘাতে বিপর্যস্ত হয়েছে এ অঞ্চলের জনজীবন। রংপুরের গত প্রায় আড়াইশ বছরের ইতিহাস ঘাঁটলে উঠে আসে একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মানবিক সংকটের চিত্র।
রংপুর গেজেটিয়ার এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, ১৭৬৯-৭০ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ছিল এ অঞ্চলের অন্যতম বড় মানবিক বিপর্যয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শোষণ, খাদ্যসংকট এবং দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে সৃষ্ট এই দুর্ভিক্ষে তৎকালীন ভারতবর্ষে প্রায় দেড় কোটি মানুষের মৃত্যু হয়। এর প্রভাব পড়ে রংপুরেও।
ঐতিহাসিক তথ্যমতে, ১৭৬৮ সালে অনাবৃষ্টির কারণে জেলার প্রায় সব ফসল নষ্ট হয়ে যায়। পরবর্তী বছর ১৭৬৯ সালের আগস্ট পর্যন্ত দীর্ঘ খরায় কৃষিজমি শুকিয়ে যায় এবং খাদ্য উৎপাদন ভয়াবহভাবে কমে আসে। সে সময় চালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। দুর্ভিক্ষে অনাহারে বহু মানুষের মৃত্যু ঘটে।
এরপর ১৭৮৭-৮৮ সালেও রংপুরে আরেকটি বড় দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। অতিবৃষ্টি, বন্যা এবং কৃষিঋণের চাপ এ দুর্ভিক্ষকে আরও তীব্র করে তোলে। খাদ্যশস্যের মূল্য বৃদ্ধি পায় এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরম দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
১৮৭৪ সালেও অনাবৃষ্টির কারণে রংপুরে খাদ্যসংকট দেখা দেয়। সে বছর কৃষকরা স্বাভাবিক উৎপাদনের মাত্র এক-সপ্তমাংশ ফসল ঘরে তুলতে সক্ষম হন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার বিনামূল্যে চাল বিতরণ, কাজের বিনিময়ে খাদ্য এবং ঋণ সহায়তা কর্মসূচি চালু করে। আগস্টের শেষদিকে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি ঘটে।
এ অঞ্চলে ১৮৫৭-৫৮, ১৮৬২-৬৩, ১৮৬৬-৬৭, ১৯০৮-০৯ সালেও অনাবৃষ্টির কারণে ব্যাপক ফসলহানির ঘটনা ঘটে। যদিও ১৮৬৬ সালের দুর্ভিক্ষ সরাসরি রংপুরে আঘাত হানেনি, তবুও অন্যান্য অঞ্চলে খাদ্যের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এখানকার বাজারেও খাদ্যদ্রব্যের দাম বৃদ্ধি পায়।
রংপুরের ইতিহাসে ১৮৯৭ সালের ১২ জুনের ভূমিকম্প একটি স্মরণীয় ঘটনা। বাংলাদেশ, আসাম ও বিহাজুড়ে অনুভূত এই ভূমিকম্প কয়েক মিনিট স্থায়ী হয়েছিল। এতে জেলার বিভিন্ন স্থানে ভূমিতে বড় বড় ফাটল সৃষ্টি হয় এবং মাটি ফুঁড়ে বালি ও পানি বের হয়ে আসে।
ভূমিকম্পের ফলে বহু আবাদি জমি বালিতে ঢেকে যায় এবং কৃষিকাজের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। সরকারি-বেসরকারি অসংখ্য স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী, সে সময় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৩০ লাখ টাকারও বেশি, যা তৎকালীন সময়ে ছিল বিশাল অঙ্ক।
এ দুর্যোগের ফলে জেলার বেশ কয়েকটি নদী ও খালের গতিপথ এবং গভীরতায়ও পরিবর্তন আসে। অনেক নদী ও জলাশয় আংশিক ভরাট হয়ে যায়। স্থানীয় ইতিহাসবিদদের মতে, রংপুর শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত বর্তমান শ্যামাসুন্দরী খালের রূপান্তরের পেছনেও ওই ভূমিকম্পের প্রভাব রয়েছে।
বন্যাও রংপুরের ইতিহাসে বারবার আঘাত হেনেছে। ১৮৭০ ও ১৮৭৫ সালে বড় ধরনের বন্যার ঘটনা ঘটে। পরে স্বাধীনতার পর ১৯৭৪, ১৯৮৭ ও ১৯৮৮ সালের বন্যা এ অঞ্চলের জনজীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।
এদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষও রংপুরের মানুষকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি করে। চাল আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং খাদ্য উৎপাদন কমে যাওয়ায় তৎকালীন বাংলার অন্যান্য অঞ্চলের মতো রংপুরেও খাদ্যসংকট দেখা দেয়। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার লঙ্গরখানা চালু করে।
মাত্র তিন দশক আগেও রংপুর অঞ্চল ‘মঙ্গাপীড়িত’ এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল। আশ্বিন ও কার্তিক মাসে কাজের অভাবে হাজার হাজার মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করতেন। তবে কৃষি প্রযুক্তির উন্নয়ন, সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং বহুমুখী ফসল চাষের ফলে বর্তমানে সেই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন হয়েছে। আগে যেখানে বছরে একটি ফসল উৎপাদিত হতো, এখন অনেক জমিতে তিন থেকে চারটি ফসল আবাদ হচ্ছে।
তবে নতুন উদ্বেগের নাম জলবায়ু পরিবর্তন। কৃষিবিদ ও পরিবেশবিদদের মতে, ঋতুচক্রের পরিবর্তন, অতিরিক্ত তাপপ্রবাহ, অসময়ের বৃষ্টি এবং দীর্ঘ খরার কারণে কৃষি উৎপাদন নতুন করে হুমকির মুখে পড়ছে।
তাদের আশঙ্কা, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে রংপুরসহ দেশের উত্তরাঞ্চল আবারও বড় ধরনের পরিবেশগত ও কৃষি সংকটে পড়তে পারে।

