যে কারণে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে বড় পতন: আল-জাজিরার বিশ্লেষণ

0
যে কারণে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে বড় পতন: আল-জাজিরার বিশ্লেষণ

বিশ্বজুড়ে সংকট দেখা দিলে সাধারণত স্বর্ণের দাম বেড়ে যায়। কারণ বিনিয়োগকারীরা মূল্যস্ফীতি ও অনিশ্চয়তার সময় স্বর্ণকে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করেন। কিন্তু এবার চিত্র ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানবিরোধী সামরিক অভিযানের মধ্যেও স্বর্ণের দাম ঊর্ধ্বমুখী না হয়ে বরং কমছে।

গত কয়েক মাসে স্বর্ণের বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি প্রতি আউন্স (প্রায় ৩১ দশমিক ১ গ্রাম) স্বর্ণের দাম সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৩০৩ ডলারে উঠেছিল। কিন্তু শুক্রবার তা নেমে এসেছে প্রায় ৪ হাজার ২৩৫ ডলারে।

বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে প্রধান কারণ হলো মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমানোর পরিবর্তে আরও বাড়াতে পারে- এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

মূল্যস্ফীতির চাপ ও হরমুজ সংকট
বর্তমান মূল্যস্ফীতির বড় একটি কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে হরমুজ প্রণালীর সংকটকে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের পর ইরান পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। সরবরাহে বাধা তৈরি হওয়ায় জ্বালানির দাম বেড়ে যায়, যার প্রভাব পড়ে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে।

যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে মূল্যস্ফীতি তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে, যা প্রায় ৪ দশমিক ২ শতাংশ। একই সময়ে দেশটির শ্রমবাজারও তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। ফলে দ্রুত সুদের হার কমানোর যে প্রত্যাশা ছিল, তা দুর্বল হয়ে পড়েছে।

কেন সুদের হার বাড়লে স্বর্ণের দাম কমে?
স্বর্ণ সাধারণত মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে সুরক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু সুদের হার বেড়ে গেলে স্বর্ণের আকর্ষণ কমে যায়। কারণ সোনা একটি ‘নন-ইল্ডিং’ বা আয়বিহীন সম্পদ। অর্থাৎ স্বর্ণ থেকে কোনও সুদ বা লভ্যাংশ পাওয়া যায় না। শুধু দাম বাড়লেই বিনিয়োগকারীরা লাভ করেন।

আর্থিক ওয়েবসাইট অপশন স্প্রেডার্স ডটকমের প্রধান অপশন বিশ্লেষক জাস্টিন কার্ডওয়েল বলেন, “সম্পদ হিসেবে স্বর্ণ বাস্তব অর্থের সবচেয়ে কাছাকাছি। এটি কোনও লভ্যাংশ দেয় না, তবে এর মূল্য বাড়লে বিনিয়োগকারীরা লাভবান হন।”

তার মতে, সুদের হার বেশি হলে বিনিয়োগকারীরা ডলারের দিকে ঝুঁকে পড়েন এবং তখন স্বর্ণের চাহিদা কমে যায়।

এক মাসে পতন ৯ শতাংশ
সম্প্রতি স্বর্ণের দাম প্রতি আউন্স ৪ হাজার ১৬০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে, যা চলতি বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা- সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণ বিক্রি করে অন্য সম্পদে ঝুঁকছেন।

এছাড়া ইরান সংকটের কারণে মার্কিন ডলার শক্তিশালী হয়েছে। যেহেতু আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম ডলারে নির্ধারিত হয়, তাই ডলার শক্তিশালী হলে সাধারণত স্বর্ণের দাম চাপের মুখে পড়ে।

নোবেল গোল্ড ইনভেস্টমেন্টসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কলিন প্লুম বলেন, “ডলার শক্তিশালী হলে স্বর্ণ চাপ অনুভব করে, আর ডলার দুর্বল হলে সাধারণত স্বর্ণের দাম বাড়ে। বর্তমানে ডলার শক্তিশালী হওয়ায় স্বর্ণের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।”

ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা
প্লুম বলেন, “এ বছরের বাকি সময় এবং সম্ভবত আগামী কয়েক বছরের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- এরপর কী হবে?”

তার মতে, কয়েক মাস আগেও বাজারে প্রত্যাশা ছিল সুদের হার কমবে। ফলে বিভিন্ন সম্পদের দাম বাড়ছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় সব ধরনের সম্পদই প্রভাবিত হচ্ছে, আর সুদের হারের প্রতি স্বর্ণ সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল।

ইরান যুদ্ধের আগে নীতিগত অবস্থানের অংশ হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফেডারেল রিজার্ভকে সুদের হার কমানোর জন্য চাপ দিয়েছিলেন। তবে বর্তমানে বাজার বিশ্লেষণকারী সিএমই ফেডওয়াচ টুলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশের বেশি।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি স্বর্ণের দামের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

যুদ্ধ শেষ হলে কি বাড়বে স্বর্ণের দাম?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতার খবর প্রকাশের পর শুক্রবার স্বর্ণের দাম আগের দিনের তুলনায় সামান্য বেড়েছে।

কার্ডওয়েলের মতে, যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনার খবর স্বর্ণের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। কারণ যুদ্ধের উত্তেজনা কমলে মূল্যস্ফীতিও ধীরে ধীরে কমার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এর প্রভাব দেখতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।

তার মতে, বর্তমানে স্বর্ণের যে দামের স্তর রয়েছে, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন পর্যায় হতে পারে। যুদ্ধ শেষ হলেও সুদের হার, ডলারের অবস্থান এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মতো অনেক বিষয় স্বর্ণের দামের ওপর প্রভাব ফেলবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বর্ণ এখনও দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ থাকলেও স্বল্পমেয়াদে সুদের হার ও ডলারের শক্তির কাছে চাপের মুখে রয়েছে। সূত্র: আল-জাজিরা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here