‘ইরান দল খেলছে না, খেলছে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের দল।’ লস অ্যাঞ্জেলেসে বিশ্বকাপ মাঠে গড়ানোর আগেই ফুটবল আর রাজনীতিকে আলাদা করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে এভাবেই নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করলেন রুজবেহ ফারাহানিপানি। ২০০০ সালে রাজনৈতিক কারণে ইরান থেকে পালিয়ে আসা এই অধিকারকর্মী এখন লস অ্যাঞ্জেলেসের বৃহৎ ইরানি কমিউনিটির একজন পরিচিত মুখ। তার কাছে এই বিরোধিতা অত্যন্ত ব্যক্তিগত, কারণ বর্তমান সরকারের দমন-পীড়নে তিনি হারিয়েছেন তার মা ও স্বজনদের। তবে যুদ্ধ বা সংঘাত নয় বরং এক ছায়াযুদ্ধের আবহ তৈরি হয়েছে খেলাকে কেন্দ্র করে।
চলতি বিশ্বকাপে লস অ্যাঞ্জেলেস ও সিয়াটলে ইরানের ম্যাচ থাকায় সেখানকার ইরানি-আমেরিকান প্রবাসীদের মধ্যে চরম দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। একদিকে ফুটবলপ্রেমী জাতি হিসেবে নিজেদের দলের প্রতি ভালোবাসা, অন্যদিকে দেশের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর প্রতি ঘৃণা; এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন তারা। বিশেষ করে ১৫ জুন সোফি স্টেডিয়ামে নিউজিল্যান্ডের মুখোমুখি হবে ইরান, আর তার আগেই স্টেডিয়ামের বাইরে শুরু হয়েছে তুমুল বিক্ষোভ।
বিক্ষোভকারীদের হাতে শোভা পাচ্ছে সবুজ, সাদা আর লাল রঙের একটি পতাকা, যার মাঝে রয়েছে সিংহ ও সূর্যের প্রতীক। ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের আগের এই পতাকাটি এখন প্রবাসীদের কাছে প্রতিরোধের মূল প্রতীক হয়ে উঠেছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, বর্তমান সরকারের পতাকায় থাকা ইসলামিক প্রতীক তাদের দেশের প্রতিনিধিত্ব করে না বরং এটি একটি দমনকারী সরকারের প্রতীক। অতি সম্প্রতি ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলনে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর ঘটনা এই ক্ষোভকে আরও উসকে দিয়েছে। আন্দোলনকারীদের স্পষ্ট অভিযোগ, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের বৈধতা জাহির করতে ফুটবলকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে তেহরান।
তবে ফিফা এই সিংহ ও সূর্য খচিত পতাকাকে রাজনৈতিক প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করে স্টেডিয়ামের ভেতরে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থার এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে আন্দোলনকারীরা বলছেন, আমেরিকার মাটিতে দাঁড়িয়ে ফিফা মানুষের বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে পারে না। অন্যদিকে, ইরান ফুটবল ফেডারেশন টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়ার অন্যতম শর্ত হিসেবে তাদের বর্তমান অফিশিয়াল পতাকার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের দাবি জানিয়েছে।
খেলোয়াড়রা রাজনীতিকে ফুটবল থেকে দূরে রাখার আহ্বান জানালেও সাধারণ ইরানি প্রবাসীদের পক্ষে তা মেনে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। আন্দোলনকারীদের অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে বলছেন, মাঠে যারা লড়ছেন তারা তাদেরই সন্তান কিন্তু বর্তমান সরকারের জার্সি গায়ে জড়ানোর পর তারা আর শুধু খেলোয়াড় থাকেন না, সরকারের প্রচারযন্ত্রের অংশ হয়ে যান।

