যুক্তরাজ্যের আইন সংস্থা ও উপদেষ্টাদের একটি গোপন চক্র দেশটিতে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য অভিবাসীদের সমকামী হওয়ার ভান করতে সহায়তার বিনিময়ে হাজার হাজার পাউন্ড হাতিয়ে নিচ্ছে।
বুধবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের প্রথম পর্বে বলা হয়েছে, কীভাবে ভিসার মেয়াদ শেষ হতে চলা অভিবাসীদের ভুয়া অজুহাত দেওয়া হচ্ছে এবং সমর্থনসূচক চিঠি, ছবি ও মেডিকেল রিপোর্টের মতো জাল প্রমাণ জোগাড় করার কৌশল শিখিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এরপর তারা নিজেদের সমকামী দাবি করে এবং পাকিস্তান বা বাংলাদেশে ফিরে গেলে জীবনহানির আশঙ্কা প্রকাশ করে আশ্রয়ের জন্য আবেদন করে।
ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র দফতর বলেছে, “এই ব্যবস্থার অপব্যবহারের চেষ্টা করতে গিয়ে ধরা পড়া যেকোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যার মধ্যে যুক্তরাজ্য থেকে বহিষ্কারও অন্তর্ভুক্ত।”
যুক্তরাজ্যের আশ্রয় প্রক্রিয়া এমন ব্যক্তিদের সুরক্ষা দেয়, যারা নিজেদের দেশে ফিরে যেতে পারে না। কারণ সেখানে তারা বিপদে পড়বে; যেমন পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মতো দেশ, যেখানে সমকামিতা অবৈধ।
কিন্তু বিবিসি নিউজের অনুসন্ধানে প্রকাশ পেয়েছে, যুক্তরাজ্যে থাকতে ইচ্ছুক অভিবাসীদের কাছ থেকে ফি আদায়ের জন্য আইনি উপদেষ্টারা পরিকল্পিতভাবে এই প্রক্রিয়ার অপব্যবহার করছে। এরা প্রায়শই এমন লোক যাদের ছাত্র, কর্ম বা পর্যটন ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে।
গোপন সূত্রে পাওয়া তথ্যসহ প্রাথমিক প্রমাণ সংগ্রহের পর, অভিবাসন উপদেষ্টারা মিথ্যা আশ্রয় আবেদন তৈরিতে মানুষকে সাহায্য করতে কতটা ইচ্ছুক ছিলেন, তা তদন্ত করতে বিবিসি ছদ্মবেশী সাংবাদিকদের পাঠিয়েছিল।
সাংবাদিকরা পাকিস্তান ও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন, যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হতে চলেছিল।
তদন্তে যা উঠে এসেছে
একটি আইন সংস্থা একটি জাল আশ্রয় আবেদন দাখিল করার জন্য ৭ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত ফি নিত এবং প্রতিশ্রুতি দিত যে, স্বরাষ্ট্র দফতরের আবেদনটি প্রত্যাখ্যান হওয়ার সম্ভাবনা ‘খুবই কম’।
ভুয়া আশ্রয়প্রার্থীরা তাদের আবেদনকে শক্তিশালী করার জন্য ডাক্তারি প্রমাণ জোগাড় করতে বিষণ্ণতার ভান করে সাধারণ চিকিৎসকের কাছে যেত, এমনকি একজন এইচআইভি পজিটিভ হওয়ার মিথ্যা দাবিও করেছিল।
একজন অভিবাসন উপদেষ্টা দম্ভভরে বলেছিলেন, তিনি ১৭ বছরেরও বেশি সময় ধরে জাল আবেদন দাখিল করতে সাহায্য করেছেন এবং তিনি এমন ব্যবস্থা করতে পারেন যাতে কেউ একজন মক্কেলের সাথে সমকামী যৌন সম্পর্ক থাকার ভান করতে পারে।
বিবিসির ছদ্মবেশী প্রতিবেদককে এমনকি এও বলা হয়েছিল যে, যুক্তরাজ্যে আশ্রয় পাওয়ার পর তিনি পাকিস্তান থেকে তার স্ত্রীকে নিয়ে আসতে পারেন এবং তখন তিনি লেসবিয়ান হওয়ার ভান করে একটি জাল আবেদন করতে পারবেন।
অন্য একটি সংস্থার সাথে যুক্ত একজন আইনজীবী একজন ছদ্মবেশী প্রতিবেদককে বলেছিলেন, তিনি সমকামী বা নাস্তিক হওয়ার ভান করে সফলভাবে আশ্রয় পেতে মানুষকে সাহায্য করেছেন। তিনি এক হাজার ৫০০ পাউন্ড ফি-এর বিনিময়ে একটি জাল আবেদনে সাহায্য করার প্রস্তাব দেন এবং বলেন যে, প্রমাণ তৈরি করতে আরও ২ থেকে ৩ হাজার পাউন্ড খরচ হবে।
তদন্তে আরও দেখা গেছে, সর্বশেষ ২০২৩ সালের যে তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে তিন হাজার ৪৩০টি এলজিবিটি আশ্রয় আবেদনের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এবং যৌন অভিমুখিতার ভিত্তিতে প্রায় এক হাজার ৪০০টি নতুন আশ্রয় আবেদন জমা পড়েছিল।
এগুলোর মধ্যে প্রায় ৪২ শতাংশ আবেদন করেছিলেন পাকিস্তানি নাগরিকরা এবং বিগত পাঁচ বছরের প্রতিটিতেই এই ধরনের আবেদনের সংখ্যায় তারাই ছিলেন সর্বাধিক।
একই বছরে, সমস্ত আশ্রয় আবেদনের ক্ষেত্রে পাকিস্তানি নাগরিকরা ছিলেন চতুর্থ সর্বাধিক প্রচলিত জাতীয়তার অধিকারী এবং মোট আশ্রয় আবেদনের মাত্র ৬ শতাংশ ছিল তাদের।
যৌনতার ভিত্তিতে করা আশ্রয় আবেদনের বিষয়ে এর চেয়ে সাম্প্রতিক কোনও তথ্য নেই।
কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানবিদরা লক্ষ্য করেছেন যে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানি নাগরিকদের পাশাপাশি বাংলাদেশ ও ভারত থেকে পড়াশোনা বা কাজের ভিসায় আসা অভিবাসীদের আশ্রয় আবেদনের সংখ্যায় ব্যাপক বৃদ্ধি ঘটেছে।
২০২৩ সালে যৌন অভিমুখিতার ভিত্তিতে নিপীড়নের শিকার হওয়ার দাবি করা আশ্রয়প্রার্থীদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের আবেদন প্রাথমিক পর্যায়েই মঞ্জুর করা হয়েছিল। সূত্র: বিবিসি

