মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানির পাশাপাশি অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে ইউরিয়া সারের দাম ও সরবরাহ। উৎপাদন ব্যাহত হওয়া ও সরবরাহ সংকটের কারণে গত কয়েক মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে এ সারের দামে ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে। কৃষিতে বহুল ব্যবহৃত ইউরিয়ার দাম ফেব্রুয়ারির তুলনায় মার্চে প্রায় ৪২ শতাংশ বেড়েছে। আর যুদ্ধ শুরুর পর মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে স্পট মার্কেটে ইউরিয়ার দাম প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সামনের দিনগুলোয় ইউরিয়া সারের বাজারে অস্থিরতা আরো বাড়তে পারে। সেক্ষেত্রে বৈশ্বিক কৃষি উৎপাদন বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশকে ইউরিয়ার সরবরাহ নিশ্চিতে স্থানীয় উৎপাদনে জোর দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
গ্যাস সংকটে দেশে বন্ধ রয়েছে একটি বাদে সব ইউরিয়া সার কারখানার উৎপাদন। বর্তমানে নরসিংদীর ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানাটি (দৈনিক ২ হাজার ৮০০ টন উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন) কেবল চালু রয়েছে। অন্যদিকে মজুদ যা আছে তাও নিরাপদ সীমা অর্থাৎ চার লাখ টনের নিচে। তাই বিশ্ববাজার থেকে আমদানির পাশাপাশি দেশেও ইউরিয়া সার উৎপাদন বাড়ানোর তাগিদ কৃষি খাতের বিশেষজ্ঞদের। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় ইউরিয়ার সরবরাহ দিতে না পারলে আসন্ন আমন (জুন-জুলাই) মৌসুমে দেশের প্রধান খাদ্যশস্য উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে বলে শঙ্কা তাদের।
বিশ্বব্যাংকের এপ্রিল ২০২৬-এর কমোডিটি পিঙ্কশিট প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে বিশ্ববাজারে ইউরিয়া সারের গড় দাম ছিল টনপ্রতি ৪১৫ দশমিক ৪ ডলার। ফেব্রুয়ারিতে দাম বেড়ে ৪৭২ ডলারে উন্নীত হয়। আর মার্চ শেষে গড় দাম বেড়ে ৭২৫ দশমিক ৬ ডলারে গিয়ে ঠেকে। আর সর্বশেষ বৈশ্বিক ট্রেডে স্পট মার্কেটে ইউরিয়ার দাম টনপ্রতি ৮০০ ডলার ছাড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি চললেও আমেরিকার পাল্টা নৌ-অবরোধ এবং নতুন করে যুদ্ধ শুরুর আভাসে স্পট মার্কেটে পণ্যটির দাম বাড়ছে।
ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধি, চুক্তি অনুযায়ী ইউরিয়াপ্রাপ্তি বিঘ্নিত হওয়া, নতুন করে দরপত্রে সরবরাহকারী না পাওয়ায় বিশ্বব্যাপী ক্রেতারা স্পট মার্কেটের দিকে ঝুঁকছে। যার কারণে স্পট মার্কেটে ইউরিয়া সারের দাম টনপ্রতি ৮০০ ডলার ছাড়িয়েছে। শনিবার শিকাগো বোর্ড অব ট্রেডে (সিবিওটি) ইউরিয়ার দাম ৮৫০ ডলারে পৌঁছেছে।
আসন্ন আমন মৌসুমের আগে বেসরকারিভাবে দুই লাখ টন ইউরিয়া আমদানি করতে চায় বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)। এজন্য দুই দফা দরপত্র আহ্বান করা হয়। তবে এতে সরবরাহকারীদের কাছ থেকে তেমন সাড়া পাওয়া যায়নি। এখন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটি তৃতীয় দফায় দরপত্রে যাওয়ার চিন্তা করছে বলে দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
বিসিআইসি সূত্রে জানা গেছে, প্রথম দফায় আন্তর্জাতিক দরপত্রে কোনো সাড়াই পাওয়া যায়নি। এরপর দ্বিতীয়বার দরপত্র আহ্বান করা হয়। কিন্তু সেখানেও সরবরাহকারীদের কাছ থেকে কেবল ৫০ হাজার টন ইউরিয়া সরবরাহের জন্য দরপত্র পাওয়া গেছে, যা চাহিদার মাত্র ২৫ শতাংশ।
আমন মৌসুম সামনে রেখে মজুদ বাড়াতে দুই লাখ টন ইউরিয়া আমদানির জন্য উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করে বিসিআইসি। সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের সঙ্গে জিটুজি (সরকার থেকে সরকার) ভিত্তিতে আরো তিন লাখ টন ইউরিয়া আনার বিষয়েও কথাবার্তা হচ্ছে। তবে তা আসা নির্ভর করছে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার ওপর। পাশাপাশি জিটুজি পদ্ধতিতে ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, চীন ও রাশিয়া থেকে দ্রুত সময়ের মধ্যে সার আমদানি করতে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে সরকার। বিসিআইসি মনে করছে, চুক্তিভুক্ত ইউরিয়া আমদানির পাশাপাশি দেশীয় কারখানাগুলো পুরোদমে চালু করা গেলে চলতি কৃষি মৌসুমে চাহিদামতো সার সরবরাহ সম্ভব হবে।
বিসিআইসি সূত্র জানিয়েছে, দেশের ইউরিয়া সারের মজুদ পরিস্থিতি ও আমদানি প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার কারণে বন্ধ থাকা কারখানাগুলো চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সরকার সার উৎপাদনে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। আগামী ১ মে থেকে ঘোড়াশাল-পলাশের পাশাপাশি কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি (কাফকো) ও শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানিতে (এসএফসিএল) গ্যাস সরবরাহ দিলে উৎপাদন শুরু হবে। পাশাপাশি সংকট মোকাবেলায় গ্যাস সরবরাহ পেলে চিটাগং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার কোম্পানি (সিইউএফএল) ও যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের (জেএফসিএল) উৎপাদন শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে।
জানতে চাইলে বিসিআইসির পরিচালক (বাণিজ্যিক) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘জ্বালানির পাশাপাশি কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য সার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দেশে উৎপাদন হলেও বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটে সেখানেও ব্যাঘাত ঘটছে। আবার বৈশ্বিক গ্যাস সংকট এবং মূল্যবৃদ্ধিতে ইউরিয়ার দামও অনেক বেড়েছে। সব মিলিয়ে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর মতো আমরাও চুক্তি অনুযায়ী আমদানি, জিটুজি পদ্ধতিতে দ্রুত ইউরিয়া সংগ্রহের চেষ্টা করছি। সরকারের প্রতিশ্রুত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত হলে ইউরিয়ার উৎপাদন বাড়িয়ে চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।’
দেশে ইউরিয়া সারের মজুদ পরিস্থিতি ও বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘বৈশ্বিক বাজারে সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি সরবরাহকারীরা এখন দরপত্রে উৎসাহী কম হবে—এটাই স্বাভাবিক। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে প্রতিদিনই দামের পরিবর্তন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে দরপত্র প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে নিরুৎসাহিত করবে। আগে বিসিআইসি বছরে ১৯ লাখ টন পর্যন্ত ইউরিয়া উৎপাদন করেছে, যা চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ। এখন সেটি উল্টো হয়ে গেছে, এখন বছরে ৮-১০ লাখ টন উৎপাদন করে আর চাহিদার বাকি ৮০ শতাংশের মতো আমদানি করা হয়। এভাবে বিশ্ববাজারের ওপর বড় নির্ভরতা থাকলে যুদ্ধের মতো বিরূপ পরিস্থিতিতে সংকট তৈরি হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।’
ড. জাহাঙ্গীর আলম মনে করেন, এ পরিস্থিতিতে আমদানির ওপর নির্ভর না করে শুধু গ্যাস সরবরাহ বাড়িয়ে ইউরিয়া উৎপাদনের মাধ্যমে সংকট নিরসন সম্ভব। বাইরে থেকে গ্যাস কিনে এনে কারখানাগুলো চালু রেখে সার উৎপাদন করলে আমদানির চেয়ে এক-তৃতীয়াংশ অর্থ সাশ্রয় হবে। তাই অর্থ সাশ্রয় ও সারের সংকট কাটাতে উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই।
দেশে ইউরিয়া সারের বার্ষিক চাহিদা ২৬ লাখ টনের মতো। চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২৬) এ পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ১৩ লাখ ১৪ হাজার ৩৮৮ টন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে ইউরিয়া সারের মজুদ ছিল ৩ লাখ ৪৩ হাজার টন, যেখানে চার লাখ টন মজুদকে দেশের সার্বিক কৃষি উৎপাদনের জন্য নিরাপদ ধরা হয়। অর্থাৎ দেশে বর্তমানে ইউরিয়া সারের মজুদ ন্যূনতম নিরাপদ সীমার নিচে রয়েছে। এ অবস্থায় ইউরিয়ার দ্রুত আমদানি ও দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি ছাড়া দেশের প্রধান খাদ্যশস্য ধান উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
সূত্র: বণিক বার্তা

